
স্বরূপ, লীনা, শৈবাল, রাহুল (ছবি: ফেসবুক)গত ২৯ মার্চের পর থেকে তোলপাড় টলিউড। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের আকস্মিক মৃত্যুতে এখনও শোকস্তব্ধ সকলে। শোকের ছায়া বাংলা বিনোদন জগতে। এই মৃত্যু ঘিরে রয়েছে নানা ধোঁয়াশা। উঠে আসছে নানা রকম তত্ত্ব। ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই তুলছেন নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন। এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করছেন অনেকেই। প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে আর্টিস্ট ফোরাম ও প্রিয়াঙ্কা সরকার অভিযোগ দায়ের করেছেন।
মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল থেকে নিজেদের সুরক্ষার দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য একজোট হয়ে কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে ওয়েস্ট বেঙ্গল মোশন পিকচার্স আর্টিস্ট ফোরাম (West Bengal Motion Picture Artist Forum) ও ফেডারেশন অব সিনে টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া (Federation of Cine Technicians & Workers of Eastern India/ FCTWEI)।
বন্ধ 'ভোলে বাবা পার করেগা'
শিরোনামে থাকে স্টুডিওপাড়া। 'ভোলে বাবা পার করেগা' ধারাবাহিকে শ্যুট করার সময়ই সমুদ্রে ডুবে মৃত্যু হয় রাহুলের। স্বাভাবিকভাবেই অনিশ্চিত ছিল এই মেগার ভবিষ্যৎ। ফের নতুন মোড়কে শুরু হয়েছিল 'ভোলে বাবা পার করেগা'। তবে, হঠাৎই বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় চ্যানেল। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, এই ধারাবাহিক চালানো অত্যন্ত 'অমানবিক'। মনে করা হচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় চরম কটাক্ষ এবং অভিনেতাদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তালসারিতে শ্যুটিংয়ের অনুমতি ছিল না
প্রশাসনের তরফ থেকে জানা যায়, তালসারিতে 'ভোলে বাবা পার করেগা' শ্যুটিংয়ের কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। যদিও, প্রযোজনা সংস্থা ম্যাজিক মোমেন্টস মোশন পিকচার্স-র তরফ থেকে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়, "আমাদের যাবতীয় যোগাযোগ, প্রাপ্ত অনুমতিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট নথি সবই আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং মনোনীত প্রতিনিধির কাছে পেশ করব, যদি তাঁরা তা দেখতে ইচ্ছুক হন। তদন্তকাজে প্রয়োজনীয় সমস্ত নথি ও তথ্য-প্রমাণ সরবরাহ করার মাধ্যমে পূর্ণ সহযোগিতা করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।"

'গুপি শুট' চলছিল!
আজতক বাংলার (বাংলা ডট আজতক ডট ইন) কাছে ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস অভিযোগ তোলেন, প্রযোজনা সংস্থা 'গুপি শ্যুটি' করছিল। ফেডারেশনের কাছে কি এই শ্যুটিংয়ের তথ্য ছিল? স্বরূপ বলেন, "আমাদের কাছে তথ্য ছিল কিন্তু কোনও অনুমতি দেওয়া হয়নি। অনুমতি না নিয়ে করলেই সেটা 'গুপি শুট'। এটা সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাসভঙ্গতা। আমাদের জানানো হয়েছিল তবে কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। এটাকে 'গুপি শুট'-ই বলা হয়।"
ম্যাজিক মোমেন্টস মোশন পিকচার্সের মতো, ইন্ডাস্ট্রির তাবড় প্রযোজনা সংস্থা এবং চ্যানেলের পক্ষে এভাবে আড়াল করে শ্যুট সম্ভব? উত্তরে স্বরূপ বলেন, "দুর্ঘটনা ঘটেছে বলেই শুধুমাত্র এটা জানা গেছে। টলিপাড়ায় এরকম অনেক হচ্ছে বলেই, আমি বা আমরা এতটা সোচ্চার ছিলাম। যারা 'গুপি শ্যুট' দিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, কেস করেছিলেন, সাপোর্ট করেছিলেন, এই প্রশ্নের উত্তর তাঁরাই দেবেন। অনির্বাণ ভট্টাচার্য, সুদেষ্ণা রায়, সুব্রত সেনরা বলতে পারবেন।"
স্বরূপ আরও জানান, সেদিন তালসারির শ্যুটিংয়ে যে সমস্ত টেকনিশিয়ানরা ছিলেন এবং যেসব গিল্ড যুক্ত, তাঁদের উদ্দেশ্যে ফেডারেশনের তরফে অন্তর্বর্তী চিঠি ইস্যু করা হচ্ছে। সেদিন, ওখানে ঠিক কী পরিস্থিতি হয়েছিল, তা জানতে চাওয়া হবে তাঁদের কাছে। তাঁদের জবাবের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
'গুপি শ্যুট' কী?
টলিপাড়ার খুব চেনা ও চর্চিত শব্দ 'গুপি শ্যুট'। আগেও বহুক্ষেত্রে 'গুপি শ্যুট'-র কারণেই ফেডারেশন ও প্রযোজকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে দেখা গেছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে কী এই শ্যুট? আসলে, টলিউড বা বাংলা বিনোদন জগতে ফেডারেশনের নিয়ম বা অতিরিক্ত টেকনিশিয়ান নেওয়ার চাপ এড়াতে গোপনে যে শ্যুটিং করা হয়, তাকেই চলতি কথায় 'গুপি শ্যুট' বলা হয়। এটা মূলত প্রযোজক বা পরিচালকদের, ফেডারেশনের আওতার বাইরে গিয়ে, কম খরচ এবং কম লোক নিয়ে চুপিচুপি কাজ সম্পন্ন করার একটি উপায়।
'গুপি শুটে'র আওতায় কী কী পড়ে?
ফেডারেশনকে না জানিয়ে বা তাদের নিয়ম এড়িয়ে এই ধরণের শ্যুটিং করা হয়। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে, ফেডারেশনের টেকনিশিয়ানদের পরিবর্তে বাইরের লোক বা নিজস্ব টিমের সাহায্যে কাজ চালানো হয়। মূলত ফেডারেশনের অতিরিক্ত টেকনিশিয়ান নেওয়ার খরচ এবং অসহযোগিতা থেকে বাঁচতে এই ধরণের গোপন শ্যুট করা হয়। টলিউডে মিউজিক ভিডিও থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়েব সিরিজ বা ছবির শ্যুটিংয়ে এমন ঘটনার অভিযোগ উঠেছে বারবার।
প্রসঙ্গত, টলিপাড়ার পরিচিত মুখ রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। সপ্তাহখানেক আগে, তালসারিতে 'ভোলে বাবা পার করেগা' ধারাবাহিকের শ্যুটিং করতে গিয়ে জলে ডুবে মৃত্যু হয় অভিনেতার। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মৃত্যু নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠে আসে। রবিবার পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে রাহুলের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। ছোটপর্দা, বড়পর্দা, মঞ্চ থেকে ওটিটি, সব মাধ্যমেই নিজের অভিনয় দক্ষতায় সকলের মন বারবার জয় করেছেন। সম্প্রতি নিজের পডকাস্ট চ্যানেলের মাধ্যমের সকলের মনের আরও কাছে পৌঁছান অভিনেতা।
তাম্রলিপ্ত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়াত অভিনেতার ময়নাতদন্ত হওয়ার পরই দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। মৃত্যুর পরের দিন, সোমবার তাম্রলিপ্ত হাসপাতাল সূত্রের খবর, যে পরিমাণ বালি ফুসফুসে পাওয়া গিয়েছে তা অস্বাভাবিক। কম সময় জলে ডুবে থাকলে এত বালি পাওয়া যেত না। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, অন্তত এক ঘণ্টা জলের তলায় ডুবে ছিলেন রাহুল। জলের তলায় হয়তো সেই অবস্থাতেই পড়েছিলেন। সেই কারণে হয়তো তাঁর দেহ থেকে এতটা বালি ও নোনা জল মিলেছে।