ফাইল ছবিBidhansabha Election 2026 BJP North Bengal: গত বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গে প্রায় নিশ্ছিদ্র আধিপত্য বজায় রেখেছিল বিজেপি। দার্জিলিং জেলা, আলিপুরদুয়ার জেলায় বিজেপি সব কটি আসন পেয়েছিল। আধিপত্য রেখে আসন ছিনিয়ে নিয়েছিল জলপাইগুড়ি, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরেও। আসন ছিনিয়ে নিয়েছিল মালদাতেও। কার্যত শাসকদল তৃণমূলকে উত্তরবঙ্গে মাটিতে নামিয়ে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু তারপর গত ৫ বছরে একাধিক নির্বাচন হলেও তার ফায়দা তুলতে পারেনি বিজেপি। এর মধ্যে লোকসভা থেকে পঞ্চায়েত ও পুরভোট রয়েছে। ফের আরও একটি বিধানসভা নির্বাচন, কিন্তু বিজেপি কি আদৌ আধিপত্য ধরে রাখতে পারবে? সেখানে সবথেকে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে দলীয় কোন্দল ও অসন্তোষের ফলে। দলের মধ্যেই এবার ফাটলের ইঙ্গিত। টিকিট বন্টন থেকে শুরু করে প্রার্থী নির্বাচন, একাধিক জেলায় বিজেপির অন্দরে তৈরি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ। আর এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে গতবারের জেতা আসনগুলো আদৌ ধরে রাখা সম্ভব কি না, তা নিয়ে খোদ গেরুয়া শিবিরের অন্দরেই শুরু হয়েছে টানাপোড়েন।
ক্ষোভের কেন্দ্রে যে জেলাগুলি
উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায় এবার প্রার্থী তালিকায় পুরনো ও নিষ্ঠাবান কর্মীদের বদলে 'নতুন' মুখ বা অন্য দল থেকে আসা নেতাদের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। কোচবিহার ও জলপাইগুড়িতে এখানে টিকিট না পেয়ে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন আদি বিজেপি নেতাদের একাংশ। দেওয়াল লিখন মুছে দেওয়া থেকে শুরু করে বিক্ষোভ মিছিল, কিছুই বাদ যাচ্ছে না। আলিপুরদুয়ারতে প্রাক্তন সাংসদ জন বার্লার টিকিট না পাওয়া এবং নতুন প্রার্থীকে কেন্দ্র করে আদি ও নব্যের লড়াই এখানে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। রায়গঞ্জ ও বালুরঘাটেও এই জেলাগুলোতেও প্রার্থী বদল বা পুরনো নেতাদের গুরুত্ব না দেওয়ায় নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা দেখা দিয়েছে।
টিকিট বন্টন নিয়ে অসন্তোষের জেরে আলিপুরদুয়ার, দক্ষিণ দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর এবং মালদায় আড়াআড়ি বিভক্ত গেরুয়া শিবির। প্রার্থী বদলের দাবিতে কোথাও চলছে দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর, কোথাও আবার জেলা সভাপতিকে তালাবন্দি করে রাখার মতো ঘটনা ঘটছে। আলিপুরদুয়ার বিধানসভা কেন্দ্রে ব্যবসায়ী পরিতোষ দাসকে প্রার্থী করায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন আদি বিজেপি কর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, পরিতোষবাবু কখনও সংগঠনের কাজ করেননি। সোমবার রাতে আলিপুরদুয়ার জেলা কার্যালয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালান উত্তেজিত কর্মীরা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, জেলা সভাপতি মিঠু দাসকে প্রায় তিন ঘণ্টা তালাবন্দি করে রাখা হয়। মঙ্গলবারও মাথায় কালো ফেট্টি বেঁধে দলীয় কার্যালয়ের সামনে ধর্নায় বসেন কর্মীরা। যদিও বিজেপি নেতৃত্ব সাফ জানিয়েছে, প্রার্থী বদলের কোনও সম্ভাবনা নেই। যদিও বিধানসভায় বিজেপির বিদায়ী মুখ্য় সচেতক তথা শিলিগুড়ির বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ জানিয়েছেন, "আসলে বিজেপির প্রার্থী একটাই। সেটা হল পদ্মফুল। কিছু সমস্য়া আছে ঠিকই, তাতে ফলে কোনও প্রভাব পড়বে না। ফল আগের মতোই বা তার চেয়েও ভাল হবে।"
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ তথা বিদায়ী বিধায়ক অশোককুমার লাহিড়ীকে টিকিট না দিয়ে নতুন যোগদানকারী আইনজীবী বিদ্যুৎকুমার রায়কে প্রার্থী করায় বালুরঘাটে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। এর প্রতিবাদে সোশ্যাল মিডিয়ায় পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেছেন একাধিক বুথ সভাপতি ও কর্মী। তাঁদের দাবি, আন্দোলনে থাকা পুরনো কর্মীদের অবজ্ঞা করা হয়েছে। করণদিঘি কেন্দ্রে আইনজীবী বিরাজ বিশ্বাসকে প্রার্থী করায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় নেতৃত্ব। কর্মীদের দাবি, এলাকার মানুষের কাছে অপরিচিত কাউকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইংরেজবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনে বিধায়ক থাকা সত্ত্বেও প্রার্থী ঘোষণা না হওয়ায় ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, গাজোল ও মালদা বিধানসভা কেন্দ্রেও প্রার্থী বদলের দাবিতে প্রকাশ্যে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন বিজেপি কর্মীরা।
গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে বুথ স্তরে কর্মীদের সক্রিয়তা কমেছে। অনেক জায়গায় কর্মীরা নির্দল হিসেবে লড়ার বা ঘরে বসে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। বিজেপির এই অভ্যন্তরীণ গোলযোগকে কাজে লাগিয়ে হৃত জমি পুনরুদ্ধারে মরিয়া শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। কিছু বিদায়ী সাংসদদের এলাকায় দেখা না পাওয়া বা কাজ না করার অভিযোগও স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলছে। বিজেপি নেতৃত্ব ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামলেও, ক্ষোভের আগুন পুরোপুরি নেভেনি। শমীক ভট্টাচার্য, সুকান্ত মজুমদার কিংবা শুভেন্দু অধিকারীরা যদিও এসব নিয়ে মুখে ডোন্ট কেয়ার মনোভাব দেখাচ্ছেন, কোনও সমস্য়া হবে না বলেও দাবি করছেন, কিন্তু নিজেরাও কতটা বিশ্বাস করছেন তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। যদি দ্রুত এই অসন্তোষ মেটানো না যায়, তবে উত্তরবঙ্গের দুর্গে ভাঙন ধরা কেবল সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।