মাছ ধরছেন কয়েকজন মত্স্যজীবী - ছবি: PTIপশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে নয়া ন্যারেটিভ এখন মাছ, মাংস। বস্তুত, আমিষ-নিরামিষ। এই হাই-ভোল্টেজ রাজনৈতিক তর্জার আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছে পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নার মৎস্যচাষিদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও লড়াইয়ের কথা। পূর্ব মেদিনীপুরের মত্স্যজীবীরা অন্য চিন্তায় মগ্ন। তাঁদের চিন্তা, মাছচাষ নিয়ে দীর্ঘদিনের দাবি এবারের ভোটের পরে পূরণ হবে তো?
২০২৬-এর বঙ্গ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলিরর প্রধান হাতিয়ার এখন ‘মাছ-মাংসের রাজনীতি’। একদিকে তৃণমূলের অভিযোগ, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাঙালির মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ করে দেবে; অন্যদিকে বিজেপি প্রার্থীরা আস্ত কাতলা মাছ হাতে নিয়ে প্রচার করছেন এটা বোঝাতে যে, তাঁরা বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপ করবেন না।
বাংলার মাছের চাহিদার ৭০ শতাংশ আসে ময়না থেকে
ময়না মৎস্য কৃষক কল্যাণ সঙ্ঘের সম্পাদক পিন্টু দাসের মতে, ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম মাছ উৎপাদনকারী কেন্দ্র হল ময়না। পশ্চিমবঙ্গের মাছের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ মেটায় এই অঞ্চল। প্রায় ১৫,০০০ হেক্টর জমিতে এখানে মাছ চাষ হয় এবং প্রতিদিন ৫০০-র বেশি ট্রাক ওড়িশা, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও অসমে মাছ নিয়ে যায়। অথচ এত বড় অর্থনীতির কারিগরদের জন্য আজও মেলেনি কোনও সরকারি সাহায্য বা আধুনিক পরিকাঠামো।
মৎস্যচাষিদের প্রধান দাবিগুলি কী কী?
ময়নার ৪-৫ হাজার মৎস্যজীবী বর্তমানে সম্পূর্ণ নিজেদের পুঁজিতে ব্যবসা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ। তাঁদের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যাগুলি হল:
মিষ্টি জলের অভাব: মাছ চাষের জন্য নদী থেকে পরিশ্রুত মিষ্টি জলের প্রয়োজন, কিন্তু চাষিরা সম্পূর্ণ নিজেদের ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
বিদ্যুৎ বিলে ভর্তুকি: অন্ধ্রপ্রদেশ বা ওড়িশার মতো প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতে মৎস্যচাষে বিদ্যুতের ওপর বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়া হয়, যা বাংলায় অমিল।
ঋণ ও ল্যাবরেটরি: চাষিরা ব্যাঙ্ক থেকে সহজে ঋণ পান না। এছাড়া মাছের খাবার, ওষুধ ও জলের গুণমান পরীক্ষার জন্য এলাকায় কোনো হাই-টেক ল্যাবরেটরি বা ‘ফিড ল্যাব’ নেই।
পুলিশি হয়রানি ও দুর্নীতি: মাছ পরিবহণের সময় মাঝেমধ্যেই পুলিশি হয়রানি ও তোলাবাজির অভিযোগ তুলেছেন চাষিরা।
উন্নয়ন বনাম রাজনীতির ন্যারেটিভ
মৎস্যচাষি সুখদেবের ক্ষোভ, সরকার পাল্টায় কিন্তু তাঁদের ভাগ্যের চাকা ঘোরে না। নিম্নমানের ওষুধ ও অসাধু ব্যবসায়ীদের দাপটে চাষিরা অতিষ্ঠ। রাজনৈতিক দলগুলি যখন ‘মাছ খাওয়া’ নিয়ে সভা-সমাবেশ গরম করছে, তখন ময়নার মানুষ চাইছেন পাতের মাছের বদলে তাঁদের রুটি-রুজির স্থায়ী সমাধান। ময়নার চাষিদের বিশ্বাস, যদি সঠিক পরিকাঠামো, বিদ্যুৎ ভর্তুকি ও মিষ্টি জল পাওয়া যায়, তবে ময়না মাছ উৎপাদনে সারা দেশে প্রথম স্থান অধিকার করতে পারবে।