
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই আসে।Strait of Hormuz history: হরমুজ প্রণালী। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে মোটামুটি সকলেই এই জলপথের বিষয়ে এখন জেনে গিয়েছেন। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই আসে। মাত্র প্রায় ৩০ মাইল চওড়া। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম। হাজার হাজার বছর ধরে এই প্রণালী শুধু বাণিজ্যের পথ নয়, শক্তির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুও হয়ে উঠেছে।
খ্রিষ্টপূর্ণ ৪,০০০ থেকে
ঐতিহাসিকভাবে হরমুজ প্রণালী প্রাচীন যুগ থেকেই বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৪০০০ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বন্দরগুলিকে ভারত ও এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করত এই জলপথ। মশলা, রেশম, মুক্তো, ঘোড়া; বিভিন্ন মূল্যবান পণ্য এই পথে পরিবাহিত হত। সেই সময় থেকেই এর স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৩ থেকে ১৬ শতকের মধ্যে ‘হরমুজ রাজ্য’ এই অঞ্চলে একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। পারস্য উপসাগরের হরমুজ দ্বীপকে কেন্দ্র করে এই রাজ্যের উত্থান ঘটে। সেই থেকেই এই প্রণালীর নাম ‘হরমুজ’ বলে পরিচিত হয়। বাণিজ্য ও কর আদায়ের মাধ্যমে এই রাজ্য বিপুল সম্পদ অর্জন করেছিল।
১৬ শতকে ইউরোপীয় শক্তির নজর পড়ে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে। ১৫১৫ সালে পর্তুগিজ সেনানায়ক আফোঁসো দে আলবুকার্ক হরমুজ দখল করে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। এরপর প্রায় এক শতাব্দী ধরে পর্তুগিজরা এই প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে এবং জাহাজ চলাচলের উপর কর আদায় করতে থাকে।
তবে ১৬২২ সালে পরিস্থিতি বদলে যায়। পারস্যের সাফাভিদ সাম্রাজ্য এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যৌথ বাহিনী পর্তুগিজদের পরাজিত করে। এর ফলে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ পারস্যের হাতে চলে যায় এবং ইউরোপীয় শক্তির আধিপত্য কমে আসে।
আধুনিক যুগে, বিশেষ করে ২০ শতক থেকে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। তেলের আবিষ্কার এবং তার বাণিজ্য শুরু হওয়ার পর এই জলপথ আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ‘চোকপয়েন্ট’ হয়ে ওঠে। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় (১৯৮০-৮৮) ‘ট্যাঙ্কার ওয়ার’-এ উভয় পক্ষই একে অপরের তেল পরিবহন বন্ধ করার চেষ্টা করে, ফলে এই প্রণালী বারবার আন্তর্জাতিক সংঘর্ষের কেন্দ্রে উঠে আসে।
বর্তমানে এই প্রণালী ইরান এবং পশ্চিমি বিশ্বের মধ্যে উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্র। মাঝে মধ্যেই জাহাজ আটক, ড্রোন হামলা বা সামরিক মহড়া এই অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
ভূগোলের দিক থেকেও এই প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ২০ হাজার বছর আগে বরফ গলে পারস্য উপসাগর পূর্ণ হওয়ার ফলে এই জলপথের সৃষ্টি হয়। নামের উৎস নিয়ে মতভেদ থাকলেও অনেকে মনে করেন, প্রাচীন পারস্য দেবতা ‘আহুরা মাজদা’-র নাম থেকেই ‘হরমুজ’ শব্দটির উৎপত্তি।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালী শুধু একটি জলপথ নয়; এটি ইতিহাস, বাণিজ্য এবং আধুনিক ভূ-রাজনীতির এক জটিল সংযোগস্থল। অতীত থেকে বর্তমান; প্রতিটি সময়েই এই প্রণালী বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে।