কোচবিহারে মাস্টারস্ট্রোক বিজেপিররবিবার কোচবিহারে প্রধানমন্ত্রীর সভায় বড় চমক দিয়েছে বিজেপি। বিজয় সংকল্প সভায় একদিকে দেখা গিয়েছে অনন্ত মহারাজকে। অন্যদিকে গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশন (GCPA)-র অপর গোষ্ঠীর নেতা বংশীবদন বর্মনও ছিলেন উপস্থিত। যা উত্তরবঙ্গের ভোটে বড়সড় সমীকরণ বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বিজেপির রাজবংশী ভোটব্যাঙ্ক অটুট রাখতে যুযুধান দুই শিবিরের এই উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
এসআইআর পর্বে বিজেপির মধ্যে থেকে সবার আগে নাম বাদের জেরে যিনি গর্জে উঠেছিলেন তাঁর নাম অনন্ত মহারাজ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে গত ২১ ফেব্রুয়ারি ‘বঙ্গবিভূষণ’ পুরস্কার নিয়েছিলেন রাজ্যসভার বিজেপি সাংসদ তথা গ্রেটার কোচবিহার নেতা অনন্ত মহারাজ (নগেন্দ্র রায়)। তার পর থেকে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল পদ্মশিবিরের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়েছে। জল্পনার অবসান ঘটিয়ে রবিবার নরেন্দ্র মোদীর বিজয় সংকল্প সভায় দেখা গিয়েছে ‘বিদ্রোহী’ বিজেপি সাংসদ অনন্ত মহারাজকে। গত কয়েক মাস ধরে বিজেপির সঙ্গে অনন্ত মহারাজের যে টানাপড়েন চলছিল, রবিবারের এই ছবি যেন তাতে জল ঢেলে দিল।
এদিকে দীর্ঘদিন তৃণমূল কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বংশীবদন বর্মন সম্প্রতি বিজেপিতে যোগদান করেছেন। তাঁর অনুগামী গিরিজাশংকর রায় এবং আশুতোষ বর্মাকে যথাক্রমে নাটাবাড়ি ও সিতাই কেন্দ্র থেকে প্রার্থীও করেছে গেরুয়া শিবির। মোদীর সভার পরে বংশীবদন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাই গিয়েছিলাম। ’ বংশীবদন দীঘদিন ধরেই উত্তরবঙ্গে রাজবংশী সম্প্রদায়ের দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনের মুখ। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সংগঠন অতীতে তৃণমূলকে সমর্থন করেছিল। এমনকী ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও সেই সমর্থন অব্যাহত ছিল। কিন্তু গত কয়েক মাসে তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি স্পষ্ট। মূলত আসন সমঝোতা নিয়ে মতবিরোধ এই দূরত্বরেপ কারণ বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
ভোটের অঙ্ক কী বলছে?
রবিবার কোচবিহারের রাসমেলা ময়দানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্বাচনি জনসভায় দ্বিতীয় সারিতে বসার স্থান পেলেন দুই গ্রেটার নেতা অনন্ত মহারাজ ও বংশীবদন বর্মন। সভা শুরু হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ আগেই মঞ্চে ওঠেন একদা গ্রেটারের দুই শিবিরের দুই শীর্ষ নেতা। এই আবহে বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পর এবার কোচবিহার তথা উত্তরবঙ্গের রাজবংশী ভোটের সমীকরণ অনেকটাই জটিল হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এর ফলে ভোটের অঙ্ক কতটা বদলাবে? প্রসঙ্গত, উত্তরবঙ্গে রাজবংশী সম্প্রদায় মোট ভোটারের প্রায় ৩০%। রাজংবশী জনগোষ্ঠীর বড় অংশের উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, অলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুরে বসবাস। বিশেষ করে কোচবিহার জেলায় রাজবংশী ভোটব্যাঙ্ক একটা বড় ফ্যাক্টর। উত্তরবঙ্গের ৫৪টি আসনের মধ্যে কমপক্ষে ১৫টি বিধানসভা আসনে রাজবংশীরা কিংমেকার। পাশাপাশি আরও বহু আসনে তারা সুইং ভোটার। ফলে নির্বাচনের ল বদলানোর ক্ষমতা রাখে। ২০২১-এর ভোটে কোচবিহারের ৭টি আসনের মধ্যে টিএমসি জিতেছিল সিতাই ও মেখলিগঞ্জ। বিজেপি পেয়েছিল দিনহাটা, শীতলকুচি, মাথাভাঙা, কোচবিহার উত্তর ও কোতবিহা দক্ষিণ-মোট ৫টি আসন। এবারের নির্বাচনের সমীকরণে একের পর এক বদল সামনে এসেছে। রাজনীতির সেই ঘূর্ণাবর্তে অনন্ত মহারাজ ও বংশীবদন বর্মন দু’জনই এখন পদ্ম ঘনিষ্ঠ। এই পরিস্থিতিতে রাজবংশী ভোট নিজেদের দখলে রাখতে অনেকটাই এগিয়ে গেল বিজেপি। উল্লেখ্য, কোচবিহার ও সংলগ্ন জেলাগুলোতে রাজবংশী ভোট জয়ের চাবিকাঠি। অনন্ত মহারাজ ও বংশীবদন বর্মন— দুজনেই নিজ নিজ গোষ্ঠীর প্রবল প্রভাবশালী নেতা। তাঁদের এক মঞ্চে নিয়ে আসা বিজেপির জন্য কৌশলগত জয়। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও বারবার রাজবংশী সেন্টিমেন্টকে ছোঁয়ার চেষ্টা দেখা গিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ঠিক আগে এই ‘ঐক্য’ তৃণমূলের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে।