ফাইল ছবিভবানীপুরে মমতা-শুভেন্দু লড়াই ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র এখন বড় রাজনৈতিক ময়দান। বিজেপির সূক্ষ্ম জাতিগত সমীকরণ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া, গত নির্বাচনের ভোটের অঙ্ক এবং দুই প্রধান মুখ, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত ক্যারিশমা, সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর এখন কার্যত এক মহারণের মঞ্চ।
পাঁচ বছর আগে নন্দীগ্রামে মমতার বিরুদ্ধে তীব্র মেরুকরণমূলক প্রচার চালিয়ে মাত্র ১,৯৫৬ ভোটে জয় পেয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সেই সময়ের পর থেকে তিনি নিজেকে বিজেপির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এবার তিনি সরাসরি মমতার ‘দুর্গ’ ভবানীপুরে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন, নন্দীগ্রামের অভিজ্ঞতা ও কৌশলকে সামনে রেখে।
ঐতিহাসিকভাবে ভবানীপুর এক বহুজাতিক ও বহু সম্প্রদায়ের আবাস। বর্তমানে এখানে বাঙালি হিন্দু, অবাঙালি হিন্দু (বিশেষত মারওয়ারি ও গুজরাটি ব্যবসায়ী), শিখ, জৈন এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম ভোটারের উপস্থিতি রয়েছে। মোট প্রায় ১.৫৯ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ৪২ শতাংশ বাঙালি হিন্দু, ৩৪ শতাংশ অবাঙালি হিন্দু এবং প্রায় ২৪ শতাংশ মুসলিম।
ভোটার তালিকা নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক। খসড়া তালিকা প্রকাশের সময় প্রায় ৪৪ হাজার ভোটারের নাম বাদ যায়, পরে চূড়ান্ত তালিকায় আরও ২,৩৪২ জনের নাম বাদ পড়ে। নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন মাত্র ১৮ জন। পাশাপাশি ১৪ হাজারেরও বেশি ভোটারকে ‘বিচারাধীন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ, মুসলিম ভোটারদেরই বেশি করে টার্গেট করা হয়েছে।
বিজেপির কৌশল মূলত নির্ভর করছে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীভিত্তিক ভোটের ওপর। বাঙালি হিন্দুদের একাংশ ও অবাঙালি হিন্দু ব্যবসায়ী সমাজ, বিশেষ করে গুজরাট ও রাজস্থানের মারওয়ারি সম্প্রদায়, এই দুই ভোটব্যাঙ্ককে লক্ষ্য করে প্রচার চালাচ্ছে তারা। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ভবানীপুরের জাতিগত ও সামাজিক বিন্যাস নিয়ে সমীক্ষা চালিয়েছে বিজেপি।
তাদের হিসেব অনুযায়ী, ভোটারদের মধ্যে কায়স্থদের অংশ সবচেয়ে বেশি (প্রায় ২৬.২ শতাংশ), এরপর মুসলিম ভোটার (২৪.৫ শতাংশ)। ব্রাহ্মণ ভোটারদের হার তুলনায় কম (৭.৬ শতাংশ)। এছাড়া অভিবাসী ও মারওয়ারি ভোটারদেরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে।
অন্যদিকে, তৃণমূলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোটের ব্যবধান কমে আসা। ২০২১ সালের উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় ৫৮ হাজার ভোটে জয়ী হলেও, সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনে সেই ব্যবধান কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮,২৯৭-এ।
পরিস্থিতি সামাল দিতে তৃণমূলও সক্রিয়। ভবানীপুরে দলের একাধিক ‘হেভিওয়েট’ নেতা ইতিমধ্যেই মাঠে নেমেছেন। কারণ, এই কেন্দ্র শুধু মমতার রাজনৈতিক ঘাঁটি নয়, এখানেই তাঁর বাসভবন, পাশাপাশি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ দলের একাধিক শীর্ষ নেতার বাসও এই এলাকায়।
সব মিলিয়ে, ২০২৬-এর নির্বাচনকে সামনে রেখে ভবানীপুর এখন রাজ্যের সবচেয়ে হাই-প্রোফাইল এবং উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।