ফাইল ছবি পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন আর হিংসা যেন সমার্থক শব্দ। খুন, রক্তপাত, লুটপাট ছাড়াও ভোট সম্ভব বাংলায়? এমন প্রশ্ন ঘোরাফেরা করে সাধারণের মনে। ২০২৬ সালেই নির্বাচনের দিন ঘোষণার মাত্র ২ দিনের মাথায় তৃণমূল কংগ্রেসের এক বুথ সভাপতিকে কুপিয়ে খুন করা হয়েছিল। প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশের অনুমান, দলীয় কোন্দলের জেরে এই হত্যা। একই ঘটনা দেখা গিয়েছিল ২০২১-এর নির্বাচনের সময়ও। দেখেশুনে অনেকে বলছেন, ভোটের বাংলায় খুন কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্ট’ (ACLED)-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘ইন্ডিয়া টুডে’ দেখিয়েছে, গত ৬ বছরে ভারতের অন্য যে কোনও রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী হিংসার ঘটনা সবথেকে বেশি ঘটেছে।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সবথেকে বেশি রক্তপাত :
২০২১ সালের ভোটে সবথেকে বেশি হিংসার সাক্ষী থেকে পশ্চিমবঙ্গ। ৩০০টি হিংসার ঘটনা ঘটেছিল। মৃত্যু হয়েছিল ৫৮ জনের। এরপরই ছিল ২০২৪ সালের অন্ধ্রপ্রদেশের ভোট। সেখানে হিংসার ঘটনার সংখ্যা ছিল ৮৯, প্রাণহানি হয়েছিল ৩ জনের। ACLED-এর নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে বিধানসভা, সংসদীয় এবং স্থানীয় নির্বাচন মিলিয়ে ভারতে নির্বাচন-সম্পর্কিত মোট সহিংস ঘটনার ৩৫ শতাংশ (২,৫৯৩টির মধ্যে ৯০৪টি) এবং নির্বাচন-সম্পর্কিত প্রাণহানির ৫১ শতাংশ (৩২৯টির মধ্যে ১৬৮টি) ঘটনা শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই ঘটেছে।
পশ্চিমবঙ্গ বনাম বাকি রাজ্য :
যে সব রাজ্যে বিধানসভা আসন ২০০-র বেশি সেই সব জায়গায় হিংসার ঘটনাও বেশি। এমনই তথ্য মিলেছে ACLED-র থেকে। পশ্চিমবঙ্গের ২০২১ সালের নির্বাচনে প্রতি আসনে ১.০২টি হিংসার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। বড় রাজ্যগুলির মধ্যে হিংসার ঘটনার দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে ছিল উত্তরপ্রদেশ। ২০২২ সালের নির্বাচনে ৪০৩টি আসন জুড়ে ৫০টি ঘটনা ঘটেছিল, অর্থাৎ প্রতি আসনে ০.১২টি। ২০২৪ সালে মহারাষ্ট্রে ২৮৮টি আসন জুড়ে ৩৯টি ঘটনা ঘটেছিল। বিহার, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু এবং রাজস্থানের সাম্প্রতিকতম নির্বাচনে ৪০টিরও কম ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। হিংসার ঘটনার দিক থেকে তুলনামূলক ভালো জায়গায় ছিল ছোটো রাজ্যগুলি। ত্রিপুরার ২০২৩ সালের নির্বাচনে ৭০টি সহিংস ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে ২০২২ সালে মণিপুরে সংখ্যাটা ছিল ৫৬।
বাংলার সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ভোট :
২০২১ সালে বাংলায় আটদফায় ভোট হয়েছিল ২৭ মার্চ থেকে ২৯শে এপ্রিল পর্যন্ত। ভোট পড়েছিল ৮২ শতাংশ। ভোট ঘোষণার আগে থেকেই হিংসার ঘটনা শুরু হলেও তা বাড়তে থাকে ভোটপর্ব চলাকালীন।
এপ্রিল ছিল সবচেয়ে খারাপ মাস :
সেবার শুধুমাত্র এপ্রিল মাসেই ১২৩টি হিংসার ঘটনা ঘটে। প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৯ জন। ২ মে যখন ফলাফল ঘোষণা করা হয়, তখন পর্যন্ত ৩১ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছিল। মে মাসের হিংসার কারণ ছিল প্রতিশোধ। অভিযোগ, তৃণমূল জেতার পর বিরোধীদের উপর আক্রমণ শুরু হয়েছিল যথেচ্ছভাবে।
২০২১-এ হিংসার জন্য কারা দায়ি ছিল?
ACLED-র নথিবদ্ধ রিপোর্টে প্রতিটি হিংসার সঙ্গে জড়িত প্রধান অভিযুক্তের নাম রয়েছে। সেখানে উল্লেখ, ২০২০ সাল থেকে বাংলার সমস্ত নির্বাচন প্রক্রিয়াজুড়ে ৭৭টি হিংসার ঘটনার জন্য অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে। তারপরই ছিল ভারতীয় জনতা পার্টি। তাদের তরফে ২৫টি হিংসার ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। সম্পত্তি ধ্বংসের মতো অহিংস ঘটনাগুলো যোগ করলে, তৃণমূল কংগ্রেসের ভূমিকা আরও সক্রিয় ছিল।
২০২৬-এর ঘটনা :
ACLED-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি নির্বাচনী চক্রে ২৭শে মার্চ পর্যন্ত বাংলায় ইতিমধ্যেই ৪০টি সহিংস ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনও প্রাণহানি ঘটেনি। তবে ২০২১ সালের নির্বাচনের আগের এই সময়কালে ৫৯টি হিংসার ঘটনা ঘটেছিল। মৃত্যু হয়েছিল ৫ জনের।
(দ্রষ্টব্য: ACLED কর্তৃক শ্রেণীবদ্ধ করা অনুযায়ী, সহিংস ঘটনার মধ্যে দাঙ্গা, বেসামরিক নাগরিকদের উপর সহিংসতা, সংঘর্ষ এবং বিস্ফোরণ/দূরবর্তী সহিংসতা অন্তর্ভুক্ত। কৌশলগত উন্নয়ন (লুটপাট, সম্পত্তি ধ্বংস) এবং বিক্ষোভ সহিংসতার গণনা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ঘটনাগুলোকে ক্যালেন্ডার বছর অনুযায়ী রাজ্য নির্বাচন চক্রের সাথে বিন্যস্ত করা হয়েছে।)