মালদায় নরেন্দ্র মোদী দুই দিনের সফরে বাংলায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রধানমন্ত্রী এই সফরে একাধিক ট্রেনের উদ্বোধন করবেন। শনিবার, ১৭ জানুয়ারি তিনি যাবেন মালদায়। সেখানে বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের উদ্বোধন করবেন। পাশাপাশি তিনি জনসভা করবেন। ১৮ জানুয়ারি, তাঁর প্রাক নির্বাচনী ব়্যালি রয়েছে সিঙ্গুরে। প্রধানমন্ত্রী এক্স-এ লিখেছেন, 'আগামিকাল, ১৭ জানুয়ারি আমি পশ্চিমবঙ্গে থাকব। মালদায় একটি অনুষ্ঠানে ৩,২৫০ কোটিরও বেশি টাকার উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন কিংবা শিলান্যাস হবে। এছাড়াও আগামিকালের অনুষ্ঠানে হাওড়া ও গুয়াহাটির মধ্যে প্রথম বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের শুভ সূচনা করা হবে—এতে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।' তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই নিয়েও বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। বাংলা হরফে এক্স পোস্টে মোদী লেখেন, 'আগামীকাল বিজেপির সমাবেশে আমি মালদা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের কাছে যাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় আছি। প্রতিদিনই তৃণমূলের অপশাসনের কোনও না কোনও নতুন উদাহরণ সামনে আসছে। তৃণমূলের শাসনে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তিতিবিরক্ত এবং এই সরকারকে প্রত্যাখ্যান করতে তাঁরা প্রস্তুত। মানুষ চায় উন্নয়নমুখী বিজেপি সরকার।'
বেলডাঙায় মহিলা সাংবাদিককে মারের প্রসঙ্গে PM মোদী বলেন, "তৃণমূলের গুণ্ডামি আর বেশিদিন চলবে না। শীঘ্রই শেষ হবে। আমরা দেখলাম তৃণমূলের সমর্থিত গুণ্ডারা এক মহিলা সাংবিদককে কীভাবে মেরেছে! স্কুল, কলেজেও অরাজকতা চলছে। এই রাজ্যে মেয়েদের কোনও সুরক্ষা নেই। পীড়িতদের কোর্ট যেতে হয়। এই পরিস্থিতিতে বদল আনতে হবে।"
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, 'এখানে মহিলা সাংবাদিককে নির্মম ভাবে অত্যাচার করা হয়েছে। বাংলায় মেয়েদের কোনও সুরক্ষা নেই।'
'মতুয়াদের ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। যাঁরা অন্যান্য দেশে ধর্মীয় কারণে অত্যাচারের শিকার হয়ে এখানে এসেছেন, তাঁরাও ভয় পাবেন না। ভারতে সংবিধান CAA-এর মাধ্যমে এই শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দিয়েছে।'
অনুপ্রবেশ বাংলার বড় সমস্যা। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলিও অনুপ্রবেশকারীদের বের করে দিচ্ছে। তৃণমূলের নেতারাই অনুপ্রবেশকারীদের ঢোকাচ্ছে, তাদের ভোটার বানাচ্ছে। অনুপ্রবেশকারীরা দেশে আতঙ্ক ও অপরাধ সংগঠিত করে। গরিবের রোজগার কেড়ে নেয়। কিছু জায়গার ভাষাও পাল্টে যাচ্ছে। অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা বাড়ছে। মালদা-মুর্শিদাবাদের মতো রাজ্যে দাঙ্গা বাড়ছে। অনুপ্রবেশকারীদের রুখতেই হবে। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলেই অনুপ্রবেশকারীদের ওপর বড় অ্যাকশন নেওয়া হবে।
অনুপ্রবেশকারীদের জনসংখ্যা বাড়ায় মুর্শিদাবাদ ও মালদায় দাঙ্গা বেড়ে গিয়েছে। অনুপ্রবেশকারী ও সরকারের যোগসাজশকে ভাঙতেই হবে। আমি আশ্বস্ত করতে চাই, বিজেপি সরকার তৈরি হওয়ার পর অনুপ্রবেশ ও অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে বড় পদক্ষেপ করা হবে।
'অনুপ্রবেশ বাংলার বড় সমস্যা। তৃণমূল সরকার থাকলে বাংলা থেকে অনুপ্রবেশকারীদের বের করা মুশকিল। এরা আপনাদের জমির রক্ষা করেন না। তৃণমূলের নেতা, সিন্ডিকেট অনুপ্রবেশকারীদের পোর্টার বানিয়ে খেলা খেলছে। এই অনুপ্রবেশকারীরাই আপনাদের কর্মক্ষেত্রে থাবা বসাচ্ছে। মা-বোনেদের হেনস্থা করছে। অনেক অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হয় এদের জন্য। মালদা-মুর্শিদাবাদের জন্য দাঙ্গার পরিবেশও তৈরি হচ্ছে। অনুপ্রবেশকারী আর এখানকার ক্ষমতাশালী লোকেদের জোট ভাঙতে হবে। BJP সরকার গঠিত হলেই অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে।'
অনুপ্রবেশকারী প্রসঙ্গে PM মোদী বলেন, "উন্নত দেশগুলিও এখন অনুপ্রবেশকারীদের বের করে দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকেও অনুপ্রবেশকারীদের বের করে দেওয়া উচিত। কিন্তু তৃণমূল সরকার আপনার অধিকার, জমি, মা-বোনদের রক্ষা করবে কি? কে বের করবে? এরা গরিবদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, কাজ থেকে বঞ্চিত করে। অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। এদের ভাষাগত ফারাকও দেখা যাচ্ছে। মালদা ও মুর্শিদাবাদে দাঙ্গাও বাড়ছে। অনুপ্রবেশকারীদের রুখতে বড় অ্যাকশন নেওয়া হবে। "
PM মোদী বলেন, "তৃণমূলের সমর্থকেরা বন্যা পরিস্থিতিতে গরিব-পীড়িতদের টাকাপয়সা লুট করে। আমি মালদার ভূমি থেকে বলছি, বাংলায় বিজেপির সরকার তৈরি হতেই তৃণমূলের এইসব দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। গঙ্গা, মহানন্দা ও ফুলহার নদের সুরক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হবে। মালদা, পশ্চিমবঙ্গের পুরনো গৌরব ফেরানো হবে। যা ইংলিশবাজার, কালিয়াচকে দেখা যেত। আমরা মালদার কৃষক ও যুবক-যুবতীদের জন্য নতুন সুযোগ নিয়ে আসব। বিজেপি ম্যানগ্রোভ ইকোনমিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে। কোল্ড স্টোরেজের জন্য ১ লাখ কোটি টাকা ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এরপর বাংলার অন্য জায়গাতেও কোল্ড স্টোরেজের সুবিধা বাড়াব। রেশম ও পাট আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে কোটি টাকার প্রকল্প চালানো হচ্ছে। গত ১১ বছরে পাটের সমর্থন মূল্যে অভূতপূর্ব উত্থান দেখা গেছে।"
বিজেপি সরকার এলে পশ্চিমবঙ্গের পুরনো গৌরব ফেরাব। মালদার কৃষক ও যুবকদের জন্য নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হবে। আম অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বিজেপি সরকার।
সিএজি রিপোর্ট দেখলাম। মালদার বন্যাবিধ্বস্ত লোকেরা টাকা পাননি। যাঁদের টাকা পাওয়ার কথা ছিল না, তাঁরা পেয়েছেন। বন্যার মতো বিপর্যয়েও গরিবদের টাকা লুঠে নিয়েছে তৃণমূলের সমর্থকরা। বিজেপি সরকার এলে তৃণমূলের এই ধরনের কাজ বন্ধ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বললেন, 'বিজেপির পক্ষে বিপুল জনমত দেবে পশ্চিমবঙ্গ। বিহার জয়ের পর লক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গ। এই নির্মম সরকারকে বিদায় দেওয়া দরকার। মালদার মাটি থেকে আসল পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি।'

'বাংলার উন্নতি তখনই হবে যখন বাধা দেওয়া তৃণমূল নয় উন্নয়নমুখী BJP সরকার গঠন হবে।' মন্তব্য নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেন, 'না এখানে কারখানা তৈরি হচ্ছে, মালদার শ্রমিকদের বাইরের রাজ্যে কাজের জন্য যেতে হচ্ছে। আম ফলনেও কোনও লাভ পাচ্ছেন না কৃষকরা। রেশম শিল্পীদেরও উন্নতি হচ্ছে না। হকের টাকা দিচ্ছে না তৃণমূল সরকার।'
না কারখানা আছে। না কৃষকরা সুবিধা পাচ্ছেন। মালদা, মুর্শিদাবাদের যুবকরা পরিযায়ী হচ্ছে। আমচাষিদের অবস্থা শোচনীয়। লাভ পাননি তাঁরা। কারণ তাঁদের জন্য কিছুই করেনি তৃণমূল সরকার। আপনাদের হকের টাকাও দেয়নি।
মালদার পরিযায়ী শ্রমিক প্রসঙ্গে মোদী বলেন, "আজ মালদায় আপনার থেকে আপনাদের দুঃখ, বেদনা ভাগ করে নিতে এসেছি। এখানে না কারখানা আসছে, না কৃষকেরা কোনও সুবিধা পাচ্ছেন। মালদার যুবক যুবতীদের কাজ পেতে পালাতে হয়।"
নরেন্দ্র মোদী বলেন, 'বাংলা তখনই বড় হবে, যখন টিএমসি সরকারের বদলে উন্নয়নের বিজেপির সরকার হবে। তাই আমি আজ মালদায়, আপনাদের ব্যথা কমাতে এসেছি। আপনারা যেটা সহ্য করেন, সেটাই আমি সহ্য করতে এসেছি। এখানে ফ্যাক্টারি হয় না। কৃষকের সুবিধা নেই।'
TMC-কে নিশানা করে PM মোদী বলেন, "এখানকার তৃণমূল সরকার খুবই নির্দয়ী। কেন্দ্র গরিবদের জন্য যা টাকা পাঠায় তা TMC লুটে নেয়। TMC আমাদের গরিব মা-বোনদের শত্রু হয়ে উঠেছে। নিজেদের সিন্দুক ভরছে। আমি চাই বাংলায় ৫ লক্ষ টাকার সুবিধা পাক বাংলাবাসী। আয়ুষ্মান ভারত ব্যবহার করুক। একমাত্র বাংলা আয়ুষ্মান ভারত থেকে বঞ্চিত। এরা চক্রান্ত করে আয়ুষ্মান ভারতের নামও নিতে দেয় না। এই নির্মম ও নির্দয় সরকারের বাংলা থেকে বিদায় নেওয়া উচিত।"
প্রধানমন্ত্রী তীব্র আক্রমণ কর বলেন, 'এখানকার তৃণমূল সরকার নির্মম, নির্দয়। কেন্দ্র সরকার যে টাকা দেয় তা গরিব মানুষদের না দিয়ে এরা লুটে দেয়। এরা গরিবদের জন্য ভাবে না, এরা নিজেদের কোষাগার ভরতে ব্যস্ত। আমি চেয়েছিলাম বাংলার মানুষ যেন ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসার সুযোগ পান আয়ুষ্মান ভারত যোজনার আওতায়। বাংলা একমাত্র রাজ্য যেখানে এই কেন্দ্রীয় সরকারি যোজনা লাগু হতে দেওয়া হয়নি। আমার বাংলার ভাই-বোনেদের এই প্রকল্পের সুবিধা নিতে দেয় না তৃণমূল সরকার। ওদের হৃদয় পাথরের। এমন সরকারের বাংলা থেকে বিদায় জরুরি।'
বন্দে ভারত প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী এদিন বলেন, "আজ বাংলা আধডজন ট্রেন পেয়েছে। এর মধ্যে একটি মেড ইন ইন্ডিয়া বন্দে ভারত স্লিপার। জেনে খুশি হচ্ছে, দেশের প্রথম স্লিপার ট্রেন যে রাজ্য থেকে শুরু হচ্ছে তা আমাদের বাংলা। এই স্টেশনের একটি স্টেশন মালদাও। আমি বাংলার সকলকে অনেক অভিনন্দন জানাই। বন্দে ভারতের সঙ্গে বাংলা ৪ নয়া অমৃত ভারত এক্সপ্রেস ট্রেনও পেয়েছে। এতে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে। কৃষক, পর্যটক অনেক সহজে যাত্রা করতে পারবেন।"
যেখানে কখনও BJP ক্ষমতায় ছিল না, সেখানে গেরুয়া শিবির বিপুল ভোটে জয় পাচ্ছেন। উদাহরণ স্বরূপ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী BMC ভোটে মুম্বই পুরসভা, কেরলের তিরুবন্তপুরম পুর নির্বাচনে BJP-র সাফল্যের কথা তুলে ধরেন তিনি। মোদীর কথায়, 'আপনাদের আত্মবিশ্বাস দেখে আমার মনে হচ্ছে যে বাংলায় কখনও BJP জেতেনি, সেখানে এবার আপনারা তাদেরই ক্ষমতায় আনবেন।'
দিকে দিকে বিজেপির জয় প্রসঙ্গে মোদী বলেন, "মহারাষ্ট্রে BMC-তেও বিজেপিতে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের রাজধানী মুম্বইতে বিজেপি বিপুল ভোট পেয়েছে। কিছুদিন আগে তিরুবন্তপুরমেও বিজেপির মেয়র হয়েছে। যেখানে বিজেপির জন্য জেতা অসম্ভব মনে হচ্ছিল সেখানেও অভূতপূর্ব সমর্থন মিলছে। এবার বাংলার মানুষও বিজেপিকে বিপুল ভোটে বিজেপিকে জয়ী করবে।"