পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর ইস্যুপশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার ভোট সামনেই। মেরেকেটে হপ্তা তিনেক বাকি। তারপরেই ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দেবে বঙ্গবাসী। প্রথম দফার ভোটের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে যখন, তখন আরেকটি মেঘও ঘনাচ্ছে। তা হল সাপ্লিমেন্টারি লিস্টের নিষ্পত্তি। আজ অর্থাত্ সোমবার সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর সংক্রান্ত মামলার শুনানি রয়েছে। রিভাইজড ভোটার লিস্ট জমা দেবেন বিচার বিভাগীয় আধিকারিকরা। আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল ভোট। এখনও এসআইআর সংক্রান্ত জট কাটল না।
পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়
সুপ্রিম কোর্ট গত ২০ ফেব্রুয়ারি সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হস্তক্ষেপ করে। রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে তৈরি হওয়া বিশ্বাসের ঘাটতি দূর করাই ছিল এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য। তবে এই বিশেষ হস্তক্ষেপের এক মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
এখনও পর্যন্ত যা খবর, SIR-এর ফাইনাল লিস্টে প্রায় ৫৮ লাখ নাম বাদ গিয়েছিল। প্রায় ৩৩ লক্ষ নাম পুনরায় যুক্ত হতে পারে। কিন্তু তবুও প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটার তালিকার বাইরে থেকেই যেতে পারেন। গোলমাল এখানেই। এই ২৭ লক্ষকে ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সুপ্রিম কোর্ট ২০ ফেব্রুয়ারির নির্দেশে কলকাতা হাইকোর্টের ৫৩০ জন বিচারিক আধিকারিকের একটি দল গঠনের নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। পরবর্তীতে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ৭০০ করা হয়। দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড থেকে আরও ২০০ জন আধিকারিককে আনা হয়েছে।
পরবর্তী ধাপ নিয়ে অনিশ্চয়তা
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রক্রিয়া। বিচার পর্বের পর এই ট্রাইব্যুনালগুলিতে আপিল শোনা হবে। কিন্তু ১৯টি ট্রাইব্যুনাল কীভাবে ও কবে পুরোপুরি কাজ শুরু করবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে নির্বাচন শুরুর আগে সব আপত্তি নিষ্পত্তি হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। এমনকী সাংবিধানিক সঙ্কটের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার জন্য বিজেপি চেষ্টা করছে এবং রাষ্ট্রপতি শাসনের আশঙ্কার কথাও তুলেছেন। তিনি ইতিমধ্যেই দাবি করতে শুরু করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে অলিখিতি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়ে গিয়েছে। এরই মধ্যে মালদায় বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ৭ জন বিচারবিভাগীয় আধিকারিককে প্রায় ৯ ঘণ্টা ধরে ঘেরাও করে রাখার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
কী বলছেন প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার কুরেশি?
প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার এসওয়াই কুরেশির মতে, এই জটিল পরিস্থিতির একটি সহজ সমাধান রয়েছে। তিনি জানান, রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অ্যাক্ট, ১৯৫০ অনুযায়ী, যদি বিপুল সংখ্যক ভোটার বাদ পড়ে, তবে আগের বৈধ ভোটার তালিকাই (২০২৫ সালের স্পেশাল সামারি রিভিশন) কার্যকর থাকবে যতক্ষণ না নতুন সংশোধন সম্পূর্ণ হচ্ছে। তাঁর কথায়, 'যাঁদের আবেদন এখনও বিচারাধীন, তাঁদেরকেও ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরে ট্রাইব্যুনাল নেবে।'
নির্বাচনী নিয়ম অনুযায়ী, মনোনয়ন জমার শেষ দিনেই ভোটার তালিকা স্থির হয়ে যায়, প্রথম দফার জন্য ৬ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় দফার জন্য ৯ এপ্রিল। এর ফলে প্রশ্ন উঠছে, যদি তালিকা স্থির হয়ে যায়, তাহলে ট্রাইব্যুনাল গঠনের তড়িঘড়ি উদ্যোগ আদৌ কতটা কার্যকর হবে? একবার তালিকা স্থির হয়ে গেলে তাতে আর নাম যোগ বা বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, যদি না সুপ্রিম কোর্ট সময়সীমা বাড়ায়।
নির্বাচন কি সময় মতো হবে?
এই পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন, নির্বাচন কি নির্ধারিত সময়ে হবে, নাকি ট্রাইব্যুনালের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হবে? নির্বাচন কমিশনের মূল নীতি কোনও বৈধ ভোটার যেন বাদ না যায়, এটি কীভাবে রক্ষা করা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দু’টি সম্ভাব্য পথ সামনে আসছে। ২০২৫ সালের শেষ প্রকাশিত ভোটার তালিকা ধরে নির্বাচন করা। যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদেরও ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া, পরে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া। সাম্প্রতিক নির্দেশে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাইব্যুনালগুলিকে নতুন নথি গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে, তবে তার সত্যতা যাচাই করতে হবে। এছাড়া ট্রাইব্যুনালগুলি নিজস্ব পদ্ধতি তৈরি করে প্রাকৃতিক ন্যায়ের নীতি মেনে সব পক্ষের বক্তব্য শোনার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এমনকী যদি নির্বাচন কমিশনের কোনও আধিকারিক মনে করেন, ভুলভাবে কোনও নাম তালিকায় যুক্ত হয়েছে, সেক্ষেত্রেও ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।