ভারতের প্রতি কোন দলের কী মনোভাব হবে?বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই প্রথম ভোট। ফলে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। ভোটের পর ভারতের প্রতি ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। ভারতের প্রতি কোন দলের কী মনোভাব হবে?
ইতিমধ্যেই নির্বাচনী ইস্তাহার প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি; তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) এবং জামাত ই ইসলামি। বাংলাদেশের ভবিষ্যত অবস্থান বিবেচনায় এই ইস্তাহারগুলিও নয়াদিল্লির কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, মত কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
গত এক দশকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক মূলত আওয়ামি লিগ সরকারকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। ছাত্র আন্দোলনের জেরে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। তারপর সেই সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসে। অন্তর্বর্তী প্রধান মহম্মদ ইউনুস দায়িত্ব নেওয়ার পর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। কট্টরপন্থী রাজনৈতিক শক্তিরও রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের আঙিনা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্কের উষ্ণতা কমেছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
BNP র ইশতেহার
এহেন প্রেক্ষাপটে বিএনপির ইস্তাহারে বিদেশনীতি নিয়ে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। শুক্রবার ঢাকায় প্রকাশিত ইস্তাহারে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ অন্য কোনও দেশের প্রভাববলয়ে থাকবে না। সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠবে। পুরোটাই সমতা ও আত্মসম্মানের ভিত্তিতে। তিনি স্পষ্ট জানান, বাংলাদেশ অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। পাশাপাশি নিজেদের বিষয়েও বাইরের হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না।
ভারতের কাছে এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও ‘চিকেনস নেক’ করিডর নিয়ে বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক মহলে বিতর্কিত মন্তব্য শোনা গিয়েছিল। চিন সফরে গিয়ে ইউনুসের উত্তর-পূর্ব ভারত প্রসঙ্গ তোলাও নয়াদিল্লিতে অস্বস্তি তৈরি করেছিল। সেই প্রেক্ষিতে বিএনপির এই অবস্থানকে তুলনামূলকভাবে সংযত বার্তা হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।
তারেক রহমান অতীতে একাধিকবার বলেছেন, ক্ষমতায় এলে তাঁর দল পাকিস্তান বা ভারতের সঙ্গে কোনও পক্ষপাতমূলক জোটে যাবে না; বরং জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
জামাত ই ইসলামীর ইশতেহার
অন্য দিকে, জামায়াতে ইসলামির নির্বাচনী ইস্তাহারেও ভারতের প্রসঙ্গ উল্লেখযোগ্য ভাবে উঠে এসেছে। দলের সভাপতি শফিকুর রহমানের প্রকাশিত ইস্তাহারে ভারতের সঙ্গে “শান্তিপূর্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক” সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ভুটান, নেপাল, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও থাইল্যান্ডের সঙ্গেও পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
তবে ইস্তাহারে পাকিস্তানের উল্লেখ না থাকলেও মুসলিম-প্রধান দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, ব্রিটেন ও কানাডার সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে। অতীতে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই দলের অবস্থানের পরিবর্তন রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
মতামত সমীক্ষাগুলিতে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনে বিএনপি সামান্য এগিয়ে থাকলেও লড়াই প্রায় সমানে সমান। ঢাকাসহ পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাফল্য পাওয়ায় জামায়াতও আত্মবিশ্বাসী।
ফলে নির্বাচনের ফল যাই হোক, বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারের ভারতনীতি এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।