ঢাকায় মাটির নীচে মেট্রো চালাতে ভারতীয় কোম্পানিতেই আস্থা তারেকের
হাসিনা বিদায়ের পর বিরাট অদল বদল হয়েছে বাংলাদেশের কূটনীতিতে। একদা বাংলাদেশে গণহত্যা চালানো পাকিস্তানের সঙ্গে দহরম মহরম বাড়িয়েছে তারেক রহমানের সরকার। ইসলামি হুজুগে তৈরি হওয়া ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ বা মুসলিম ন্যাটোয় যোগ দিতে। ধর্মীয় বেড়াজালে তৈরি এই চুক্তিতে ইসলামিক স্বার্থের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ পূরণ হবে বলে মনে করছে তারেক সরকার। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের ‘ইসলামিক NATO’য় যোগ দিতে ঢাকা পা বাড়াচ্ছে বলেই মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ। যদিও সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও বিবৃতি দেয়নি পদ্মাপারের প্রশাসন। এদিকে চিনকে তুষ্ট রাখতে বাংলাদেশ অসংখ্য প্রকল্প দিয়ে এবং তোষামোদ করে পথ সুগম করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যখন নির্ভরযোগ্য কাজের প্রশ্ন আসে, বাংলাদেশ এটাও ভালোভাবে বুঝেছে যে সঙ্কটকালে বা বড় উন্নয়ন প্রকল্পে চিনের ফাঁকা প্রতিশ্রুতি নয়, বরং ভারতের প্রযুক্তিগত শক্তিই বেশি কার্যকর। এ কারণেই ঢাকা তার প্রথম ভূগর্ভস্থ মেট্রো রেল প্রকল্পের জন্য চিনকে পাশ কাটিয়ে ভারতের শীর্ষস্থানীয় পরিকাঠামো সংস্থা লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো (L&T)-র ওপর আস্থা রেখেছে। ভারতীয় সংস্থাটি ঢাকার কাছ থেকে ১০,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত মূল্যের বিশাল মেগা অর্ডার পেয়েছে।
L&T কোন প্যাকেজগুলো পেয়েছে?
ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (DMTCL) কর্তৃক প্রদত্ত এই মেগা প্রকল্পে L&T দুটি প্রধান চুক্তি প্যাকেজ বাস্তবায়ন করবে। এই দুটি প্যাকেজ মেট্রোর মূল পরিচালন ও কারিগরি ব্যবস্থার ভিত্তি।
প্রথম চুক্তি প্যাকেজ, CP09 – ট্র্যাকের কাজ ও বৈদ্যুতিক সিস্টেম: এই প্যাকেজে L&T তার জাপানি অংশীদার সুমিতোমো কর্পোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে। এতে চারটি প্রধান প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
দ্বিতীয় চুক্তি প্যাকেজ, CP10 – সিগন্যালিং, টেলিকমিউনিকেশন এবং প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর (PSD), সম্পূর্ণরূপে L&T দ্বারা সম্পাদিত হবে। এতে তিনটি প্রধান কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
'ঢাকা মেট্রো লাইন-১' প্রকল্প কী এবং এর নেটওয়ার্ক কত বড়?
ঢাকা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল ও যানজটপূর্ণ শহর। শহরের তীব্র যানজট নিরসন ও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা প্রদানের লক্ষ্যে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (JICA) এই প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। প্রকল্পটির দুটি প্রধান রুট রয়েছে।
সম্পূর্ণ ঢাকা মেট্রো লাইন ১ নেটওয়ার্কটি প্রায় ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। এতে মোট ১৯টি স্টেশন এবং পিতলগঞ্জে একটি বড় মেট্রো ডিপো থাকবে। নির্মাণ সম্পন্ন হলে, এই লাইনটি ঢাকার সাধারণ জনগণের জন্য একটি অত্যন্ত নিরাপদ এবং দ্রুতগতির যাতায়াতের মাধ্যম প্রদান করবে।
ভারতের ওপর আস্থা প্রকাশ কেন?
বিগত কয়েক বছরে, বাংলাদেশের পূর্ববর্তী সরকারগুলো চিনকে খুশি করার জন্য তাদের হাতে অসংখ্য পরিকাঠামো প্রকল্প তুলে দিয়েছে। তবে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ চিনের অনেক প্রকল্পের ধীর গতি বা নিম্নমানের বিষয়ে ভালোভাবে অবগত। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূগর্ভস্থ মেট্রো নির্মাণের ক্ষেত্রে, তারা চিনের পরিবর্তে বিশ্বজুড়ে অনবদ্য সুনামের অধিকারী ভারতীয় কোম্পানিকেই বেছে নিয়েছে। ঢাকা মেট্রোর সঙ্গে L&T দীর্ঘ ও গৌরবময় সম্পর্ক রয়েছে। কোম্পানিটি এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম মেট্রো রেল প্রকল্প, ঢাকা মেট্রো লাইন ৬-এর দায়িত্ব পালন করেছিল। L&T সম্পূর্ণ সমন্বিত রেল ব্যবস্থাটি যথাসময়ে এবং উৎকৃষ্ট মানের সঙ্গে সম্পন্ন করে। আজ প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ নির্বিঘ্নে লাইন ৬-এ যাতায়াত করেন।
এই সাফল্যের নজিরের ভিত্তিতে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি আবারও L&T-র ওপর আস্থা রেখেছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, L&T ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা মেট্রোর E&M সিস্টেমেও চমৎকার কাজ করছে। দেশের অভ্যন্তরে, L&T ভারতের প্রায় প্রতিটি প্রধান শহরের মেট্রো প্রকল্পের পাশাপাশি দেশের প্রথম উচ্চ-গতির বুলেট ট্রেন প্রকল্পেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর অর্থ কী?
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে L&T ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ কোটি টাকার এই বিশাল অর্ডার পাওয়াটা শুধু কোম্পানিটির জন্যই বড় ব্যাপার নয়, বরং দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।
কোম্পানি কী বলেছে?
এই গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য এবং অর্ডারটি পেয়ে আনন্দ প্রকাশ করে L&T-র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ট্রান্সপোর্টেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার বিভাগের প্রধান, রামকুমার এস বলেন, 'DMTCL-এর কাছ থেকে পাওয়া এই পুনরাদেশটি বিশ্বব্যাপী বৃহৎ আকারের নগর গণপরিবহন প্রকল্প বাস্তবায়নে L&T-র সক্ষমতার একটি প্রমাণ।'