Dhaka University : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে বসানো হল জিন্নার ছবি, পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ছে বাংলাদেশে?

মিউজিয়ামে অন্তত তিনটি জিন্নার ছবি রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চের সেই বক্তব্যের ছবি, যেখানে জিন্না পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

Advertisement
ঢাকায় বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে বসানো হল জিন্নার ছবি, পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ছে বাংলাদেশে?   বাংলাদেশে অরাজকতা?
হাইলাইটস
  • বাংলাদেশে বাড়ছে ঢাকার প্রভাব?
  • তোলপাড় বাংলাদেশ

বাংলাদেশে কি ফের বাড়ছে পাকিস্তানের প্রভাব? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (DUCSU) মিউজিয়ামে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরিয়ে সেখানে বসানো হল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ আলি জিন্নার ছবি। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ মুজিবের জায়গায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতার ছবি ঘিরেই এখন তীব্র বিতর্ক। ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার মিউজিয়ামে ঢুকে জিন্নার তিনটি ছবি নামিয়ে দেন এক পড়ুয়া। বিষয়টি নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। পরিস্থিতি নিয়ে কড়া পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও।

বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো এবং bdnews24.com-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংস্কারের পর রবিবার সাধারণ মানুষের জন্য DUCSU মিউজিয়াম খুলে দেওয়া হয়। উদ্বোধনের সময় উপস্থিত ছিলেন DUCSU-র মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা, সহ-সভাপতি শাদিক কায়েম, সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ-সহ ছাত্র সংসদের অন্যান্য প্রতিনিধিরা।

কোন ছবি সরানো হয়েছে?

সংস্কারের আগে মিউজিয়ামে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা তুলে ধরা একাধিক ছবি ছিল। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সঙ্গে যুক্ত মুজিবের ছবি সেখানে ছিল।

এছাড়াও ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের ছবিও ছিল। সেই ভাষণকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংস্কারের পর সেই ছবিগুলির অধিকাংশই আর মিউজিয়ামে দেখা যাচ্ছে না। প্রথম আলোর দাবি, শেখ মুজিবকে নিয়ে থাকা ছবিগুলির মধ্যে মূলত তাঁর দুই ছেলের ১৯৭৪ সালের বিয়ের ছবি এবং তাঁর ছবি-সহ কিছু পুরনো সংবাদপত্রের কাটিং রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে, মিউজিয়ামে অন্তত তিনটি জিন্নার ছবি রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চের সেই বক্তব্যের ছবি, যেখানে জিন্না পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এছাড়াও ১৯৪০ সালের লাহোরে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগের সম্মেলনের ছবি এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে ডন সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের ছবিও রাখা হয়েছে।

Advertisement

কেন রাখা হল জিন্নার ছবি?

DUCSU-র মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ অগস্টের পর যাঁদের ‘ফ্যাসিবাদের আইকন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, তাঁদের ছবি সরানো হয়েছে। তাঁর দাবি, জিন্নার ছবি মিউজিয়ামে রাখা হয়েছে তাঁকে মহিমান্বিত করার জন্য নয়, বরং ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা নথিভুক্ত করার উদ্দেশ্যে।

তবে DUCSU-র এক কর্মীর বক্তব্য, ২০২৫ সালের DUCSU নির্বাচনের আগে মিউজিয়ামে শেখ মুজিবের একাধিক ছবি ছিল। ইউনাইটেড স্টুডেন্টস অ্যালায়েন্স এবং বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবির-সমর্থিত গোষ্ঠী ছাত্র সংসদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সেই ছবিগুলি সরানো হয়েছে বলে ওই কর্মী দাবি করেছেন।

প্রতিবাদে নামল পড়ুয়ারা

জিন্নার ছবি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে সোমবার প্রতিবাদ শুরু হয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবু তাইয়েব হাবিলদার নামে এক পড়ুয়া মিউজিয়ামে ঢুকে জিন্নাহর তিনটি ছবি নামিয়ে দেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বাংলাভাষার বিরোধিতা করা এবং ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ছাত্রদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেওয়া জিন্নার ছবি এই মিউজিয়ামে থাকার কথা নয়। জিন্নাকে প্রদর্শনের সিদ্ধান্তের পিছনে কোনও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবির বিতর্কিত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের নতুন করে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে।

BNP-র ছাত্র সংগঠনেরও প্রতিবাদ

ঘটনার প্রতিবাদ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও। সংগঠনটির অভিযোগ, শিবির-সমর্থিত DUCSU নেতৃত্ব মুজিবের ছবি সরিয়ে ‘পাকিস্তানের প্রতি ভালোবাসা’ প্রদর্শন করছে। তাদের দাবি, এর মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।

এদিকে সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতে ইসলামি নেতা গোলাম আযমের একটি ছবি টাঙানো হয় বলেও প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র বিতর্ক রয়েছে।

ইতিহাস বদলের অভিযোগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মহম্মদ তানজিমউদ্দিন খান প্রথম আলোকে বলেন, মিউজিয়াম সংস্কারের নামে স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও স্মারক সরিয়ে একটি পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নতুন ইতিহাস তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে DUCSU-র পক্ষ থেকে জিন্নাহর ছবি রাখাকে ইতিহাস নথিভুক্ত করার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কড়া পদক্ষেপ

এই বিতর্কের মধ্যেই DUCSU-র কার্যকলাপ নিয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS) জানিয়েছে, জিন্নার ছবি প্রদর্শন-সহ DUCSU-র বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত করা হচ্ছে। অনুমোদন ছাড়া একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি এবং অনুমতি না নিয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের ওয়েবসাইট চালুর অভিযোগও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অভিযোগ, DUCSU-র একতরফা কিছু উদ্যোগ ক্যাম্পাসে একটি ‘সমান্তরাল প্রশাসন’ তৈরির প্রচেষ্টার মতো।

এই সব অভিযোগ তদন্ত করতে তিনটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন এবং অন্যান্য নিয়মভঙ্গের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

মুজিবের ছবি সরানো কেন গুরুত্বপূর্ণ?

শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি হিসেবে পরিচিত। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তবে ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় শেখ মুজিবের মূর্তি ভাঙচুর ও তাঁর স্মারক অপসারণের ঘটনা ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকারও রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে তাঁর ছবি সরায় এবং বাংলাদেশের মুদ্রা থেকে তাঁর প্রতিকৃতি সরানোর উদ্যোগ নেয়।

সেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের DUCSU মিউজিয়াম থেকে মুজিবের ঐতিহাসিক ছবির পরিবর্তে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে- বাংলাদেশের ইতিহাসকে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে এবং দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতি আগামী দিনে কোন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরা হবে।
 

Advertisement

POST A COMMENT
Advertisement