ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা জলচুক্তি গঙ্গা ফের একবার ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা জলচুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে শেষ হয়ে যাবে। এই চুক্তি পুনরায় করার আগে বাংলাদেশ তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। বাংলাদেশ জানিয়েছে, তারা নতুন চুক্তিতে একটি 'গ্যারান্টি' অন্তর্ভূক্ত করার দাবি জানাবে। এই গ্যারান্টির অর্থ হল, শুষ্ক মরশুমেও বাংলাদেশ যাতে জল সরবরাহ পেতে থাকে। প্রয়োজনে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে যেতেও ঢাকা প্রস্তুত।
মঙ্গলবার ঢাকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কর্তৃক আয়োজিত 'গঙ্গা জলচুক্তি: পুনঃআলোচনার বিষয়সমূহ' শীর্ষক এক সেমিনারে বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রী শহিদুদ্দিন চৌধুরী আনি এ কথা বলেন।
১৯৯৬ সালের চুক্তিতে কী আছে?
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দঙ্গার জল বন্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়া এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই চুক্তিটি ছিল ৩০ বছরের জন্য। এর মেয়াদ ছাব্বিশের ডিসেম্বরে শেষ হবে।
এর প্রধান উদ্দেশ্য হল শুষ্ক বা স্বল্প জলস্তরের মরশুমে ফরাক্কায় উপলব্ধ গঙ্গার জল ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্টন করা।
উল্লেখ্য, এই চুক্তিটি সারা বছরের জন্য জল বন্টনের উদ্দেশ্যে নয়, বরং প্রধানত ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সঙ্কটকালীন মরশুমের জন্য।
গঙ্গার প্রবাহ
এই চুক্তিটি সম্পূর্ণরূপে বোঝার জন্য গঙ্গার গতিপথ বোঝা জরুরি। উত্তরাখণ্ডে উৎপন্ন হয়ে গঙ্গা উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের ফরাক্কা বাঁধের পর গঙ্গা প্রধান ২টি ভাগে বিভাক্ত হয়। একটি ধারা ভাগীরথী হুগলি নামে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয় কলকাতার মধ্যে দিয়ে। অপর শাখাটি পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশে এই শাখাটি পদ্মা নামে পরিচিত। অর্থাৎ বাংলাদেশে গঙ্গা নদীই পদ্মা নামে পরিচিত।
গ্যারান্টি ক্লজের মাধ্যমে ভারতের উপর চাপ সষ্টি
১৯৯৬ সালের গঙ্গা জল বন্টন চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে। বাংলাদেশ নতুন চুক্তির অধীনে আরও নির্ভরযোগ্য জল সরবরাহ চায়। তাদের যুক্তি হল, বর্তমানে চুক্তিটি যে সময়ের জলবিজ্ঞান সংক্রান্ত তথ্য ও পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে হয়েছিল, তা আজকের চেয়ে উল্লোখযোগ্য ভাবে ভিন্ন। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং খরা নদী প্রবাহের অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশের জলসম্পদ মন্ত্রী শাহাবুদ্দিন চৌধুরী আনি মঙ্গলবার জানিয়েছেন, ঢাকা চুক্তিটি পুনরায় আলোচনা করতে প্রস্তুত এবং আশা প্রকাশ করেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী মাসে রাষ্ট্রসঙ্ঘে বাংলাদেশের দাবি জোরাল ভাবে তুলে ধরবেন। তিনি বলেন, 'আমাদের একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হবে। চুক্তি ছাড়া আমরা এগোতে পারব না। এটা আমাদের অধিকার।' শাহাবুদ্দিন চৌধুরী আলি ভবিষ্যতের জল বন্টন চুক্তিগুলিতে তথ্য জানান অধিকার সংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভূক্ত করার এবং গ্যারান্টি পুনর্বহাল করার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন। যা ১৯৭৭ সালের গঙ্গা চুক্তিতে অন্তর্ভূক্ত থাকলেও ১৯৯৬ সালের চুক্তি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশের মন্ত্রী আরও বলেন, 'বাংলাদেশ একটি চুক্তি চায়। তবে প্রয়োজনে তা অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির দ্বারস্থ হতেও প্রস্তুত। ভারত বাংলাদেশের জনগণের অধিকার ও অনুভূতিকে বুঝতে এবং সন্মান করবে বলেই আমি আশাবাদী।'
বাংলাদেশের ক্ষোভ কী নিয়ে?
বাংলাজেশ বর্তমান চুক্তি নিয়ে অসন্তুষ্ট কারণ তাদের মনে হয়, এটি শুষ্ক মরশুমে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য জলের নিশ্চয়তা দেবে না। ইমপ্রি থিঙ্ক ট্যাঙ্কের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, জল বন্টনের সূত্রটি ঐতিহাসিক জলবিজ্ঞানগত পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে তৈরি অথচ শুষ্ক মরশুমে জলের প্রবাহ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
গঙ্গার উপর নির্মিত ফরাক্কা বাঁধটি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে জল বন্টন সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিবাদের একটি প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত এই বাঁধটি নির্মাণ করেছিল গঙ্গার জলের প্রবাহ কিছু অংশ পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদী ব্যবস্থায় প্রবাহিত করা জন্য। বাংলাদেশে এটি দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত হয়ে আসছে, কারণ সেখানকার মানুষ আশঙ্কা করে এটি শুষ্ক মরশুমে জলের প্রবাহ কমিয়ে দেয়।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ফরাক্কা ব্যারেজকে একটি মৃত্যুফাঁদ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। তিনি বলেন, 'ফরাক্কার পর ভারত গঙ্গার উপর বেশ কয়েকটি ব্যারেজ ও প্রায় ৯০০টি বাঁধ নির্মাণ করেছে, যা এই দুই দেশের সম্পর্কের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে।'
ফরাক্কা ব্যারেজ বিতর্কের মূলে কেন?
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার জল বিবাদের অন্যতম প্রধান কারণ হল ফরাক্কা ব্যারেজ। পশ্চিমবঙ্গে নির্মিত এই ব্যারেজটি গঙ্গার জল হুগলি নদী ব্যবস্থায় প্রবাহিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ভারতের দাবি, ফরাক্কা কোনও বাঁধ নয়। বরং এটি একটি জলপ্রবাহ পরিবর্তনকারী পরিকাঠামো। এর মাধ্যমে প্রায় ৪০ হাজার কিউসেক জল ফরাক্কা খালে প্রবাহিত হয় এবং বাকি জল বাংলাদেশে চলে যায়।
ভারতও দাবি করেছে, গঙ্গার দলের তথ্য নিয়মিত ভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে আদান-প্রদান করা হয় এবং এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে যৌথ নদী কমিশনই হল প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা।
তবে ফরাক্কা বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই একটি রাজনৈতিক ও আবেদপ্রবণ বিষয়। বাংলাদেশের জলসম্পদ মন্ত্রীও ফরাক্কা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেদের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, তাঁর দেশে এটিকে দীর্ঘদিন ধরে একটি মৃত্যুফাঁদ হিসেবে দেখানো হয়।
গঙ্গা জলচুক্তি পর্যালোচনার আলোচনা এমন এক সময়ে উঠেছে, যখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ইতিমধ্যেই বেশ কিছু স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে জর্জরিত। জল দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যৌথ সম্পদ। বাংলাদেশের ৫৪টি প্রধান নদী ভারতের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে অথবা ভারতের সঙ্গে একটি যৌথ জল ব্যবস্থার অংশ। তাই গঙ্গা ও তিস্তা সহ বেশ কয়েকটি নদীর জল দুই দেশের সম্পর্ককে প্রাভাবিত করে।