ইসলামিক ন্যাটোতে আগ্রহী বাংলাদেশ পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের দূরত্ব ঘুচিয়ে ফের কাছাকাছি বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। সৌজন্য ইসলামিক ন্যটো। পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব আপাতত এই তিন দেশ NATO-র সদস্য। তাদের লক্ষ্য বিশ্বের আরও ইসলামিক দেশগুলিকে সঙ্গে নেওয়া। তার সূত্র ধরেই বাংলাদেশও চায় সেখানে যোগ দিতে। তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছে তারেক রহমানের সরকার।
বাংলাদেশ জানিয়েছে, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ককে নিয়ে তৈরি এই ন্যাটোতে ভবিষ্যতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে তাদের মনোভাব ইতিবাচক। কারণ, এতে নাকি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও পরিকাঠামো আরও মজবুত হবে।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় পরিবর্তন। একইসঙ্গে ভারতের জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ। কারণ, ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত ও নিরাপত্তা সম্পর্ক অনেক ঘনিষ্ঠ। এখন সেই বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানকে অধিক গুরুত্ব দেয় তাহলে তা উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
ইসলামিক NATO-তে যোগ দেওয়ার ইচ্ছে নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিদেশনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে কোনও অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরি হলে তাতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাঁর দাবি, জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ বিদেশনীতি অনুসরণ করছে ঢাকা। পাকিস্তানের সঙ্গে বিশেষ করে বাণিজ্য এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সম্পর্ক আরও জোরদার করা হচ্ছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ওই প্রতিরক্ষা জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছে। বরং ঢাকা জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এমন কোনও কাঠামোয় যোগ দেওয়ার সম্ভাবনাকে তারা উড়িয়ে দিচ্ছে না।
ভারতের প্রতিক্রিয়া অবশ্য সতর্ক। বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, পাকিস্তান-সৌদি আরব-তুরস্কের প্রতিরক্ষা সমঝোতা নিয়ে যাবতীয় ঘটনাক্রমের ওপর তারা নজর রাখছে। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কী এই ইসলামিক ন্যাটো?
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মূল লক্ষ্য সম্মিলিত প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলা। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যে কোনও একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিনটি দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এই ব্যবস্থায় একদিকে রয়েছে সৌদি আরবের বিপুল আর্থিক ও জ্বালানি শক্তি, অন্যদিকে তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা এবং পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রসমৃদ্ধ সামরিক শক্তি। ফলে বাংলাদেশের পক্ষে এই ধরনের প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যোগ দেওয়া শুধুমাত্র পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বাড়ানোর তুলনায় অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
কেন পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ?
এর অন্যতম বড় কারণ ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশের বিদেশনীতিতে বড় পরিবর্তন। শেখ হাসিনার আমলে নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বাণিজ্য, পরিকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা- বিভিন্ন ক্ষেত্রেই দুই দেশের সহযোগিতা বেড়েছিল। হাসিনার বিদায়ের পর সেই সমীকরণ বদলেছে। একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনও কমতে শুরু করেছে।
আর তা সম্পর্কের উষ্ণতা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে, বাণিজ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে ভ্রমণ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল হয়েছে এবং সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে আদানপ্রদানও বেড়েছে। সামরিক যোগাযোগও বৃদ্ধি পেয়েছে। দুই দেশের শীর্ষ আধিকারিকরা নিরাপত্তা সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ, সামরিক মহড়া এবং অস্ত্র বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। এমনকী পাকিস্তান ও চিনের যৌথভাবে তৈরি JF-17 যুদ্ধবিমান নিয়েও বাংলাদেশ আগ্রহ দেখিয়েছে।
অর্থাৎ বিষয়টি শুধুমাত্র ঐতিহাসিক পুনর্মিলনের নয়। বাংলাদেশ তার কৌশলগত বিকল্পগুলিকে আরও বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে।
ভারতের চিন্তার কারণ কী কী?
এর সবচেয়ে বড় কারণ ভৌগোলিক অবস্থান। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার পূর্ব প্রান্তে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তান ভারতের প্রধান সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী। বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যোগ দেয়, তাহলে ভারতের কৌশলগত পরিবেশ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
পাকিস্তান নতুন কৌশলগত সুযোগ পেতে পারে
দীর্ঘদিন ধরে ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান পাকিস্তানের পক্ষে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তারকে সীমিত করেছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর হলে সেই পরিস্থিতি বদলাতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় পাকিস্তানের আরও বেশি প্রবেশাধিকার তৈরি হতে পারে এবং দুই দেশের মধ্যে সামরিক আদানপ্রদান বাড়তে পারে।
চিনের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সঙ্গে চিনের ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। ফলে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বাড়লে চিন-পাকিস্তান-বাংলাদেশকে ঘিরে পরস্পর-সংযুক্ত কৌশলগত নেটওয়ার্ক তৈরি হতে পারে।
এর অর্থ অবশ্যই আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতবিরোধী কোনও জোট তৈরি হচ্ছে-এমন নয়। তবে ভারতের পূর্ব প্রতিবেশে নয়াদিল্লির কৌশলগত প্রভাব কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে সমুদ্রপথও
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে বঙ্গোপসাগর এবং বৃহত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে। পাকিস্তান ও তুরস্কও সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করছে। অন্যদিকে সৌদি আরব আঞ্চলিক জাহাজ চলাচল এবং জ্বালানি পরিবহণের নিরাপত্তার ওপর জোর দিচ্ছে। এই কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের কোনও যোগসূত্র তৈরি হলে ভবিষ্যতে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক মাত্রাও তৈরি হতে পারে।
ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সামুদ্রিক কৌশলের জন্য বঙ্গোপসাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই পরিবর্তনের ওপর নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ নজর থাকাটাই স্বাভাবিক।
তাহলে কি বাংলাদেশের কারণে ভারত নতুন সমস্যায় পড়ছে?
এখনই এমনটা বলা ঠিক হবে না। বাংলাদেশ বারবার জানিয়েছে, তারা কোনও একটি বড় শক্তির পক্ষ না নিয়ে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়। বর্তমান সরকার একইসঙ্গে ভারত, পাকিস্তান, চিন, সৌদি আরব এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এমনিতেই চাপে
বর্তমান পরিস্থিতির সময়টাও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর নয়াদিল্লি ও ঢাকার সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। বাংলাদেশ ভারত থেকে হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। অন্যদিকে ভারতে তাঁর উপস্থিতি নিয়ে তৈরি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে নয়াদিল্লিকে। তবে একইসঙ্গে দুই দেশই সম্পর্ক মেরামতের উপায় খুঁজছে।