চট্টগ্রামে অটোচালক সমীর দাসকে কুপিয়ে খুন ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণের পর থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ওসমান হাদির মৃত্যুর পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। হাদির মৃত্যুর পর থেকে বাংলাদেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে হিংসা অব্যাহত রয়েছে। সর্বত্র বিক্ষোভ, হিংসা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় আরও একজন হিন্দু অটো চালককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, হিন্দু অটোচালক সমীর দাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। চট্টগ্রামের দাগনভূঁইয়ায় অটোচালকের উপর নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে। তাঁর বয়স ২৮ বছর। এটিই বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর ধারাবাহিক হামলার সর্বশেষ ঘটনা। দাগনভূঁইয়ার একজন পুলিশ আধিকারিক হত্যাকাণ্ডের তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, হামলাকারীরা প্রথমে অটোরিকশা চালককে বেধড়ক মারধর করে এবং পরে তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। হত্যার পর, অপরাধীরা চালকের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটি চুরি করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে।
স্থানীয় পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, দুষ্কৃতীরা দেশি অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়েছিল। অভিযুক্তদের ধরতে তল্লাশি শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই পুলিশ আধিকারিক। তবে, এই ঘটনার পর বাংলাদেশে হিন্দুদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। গত একমাসে পদ্মাপারে হিন্দুদের উপর একের পর এক হামলার অভিযোগ উঠেছে। সমালোচনার ঝড় উঠলেও মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতে পারেনি ইউনূস সরকার।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই ছয়জন হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছে। তাছাড়া, আরও অনেক সংখ্যালঘুর উপর হামলা ও অগ্নিসংযোগ অব্যাহত রয়েছে। গত শনিবার, বাংলাদেশে মৌলবাদীরা ৪০ বছর বয়সী এক হিন্দু বিধবার উপর বর্বরতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করে। তাঁকে গণধর্ষণ করা হয়েছিল। তাছাড়া, ধর্ষণের পর তাঁকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে চুল কেটে ফেলা হয়েছিল। পুরো ঘটনার একটি ভিডিও তৈরি করে ভাইরাল করা হয়।
হাদির মৃত্যুর পর থেকে বাংলাদেশে হিংসা
শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি এবং মহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর থেকে, বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা, বিশেষ করে হিন্দুরা হিংসার শিকার হচ্ছে। ধর্মীয় বৈষম্যবিরোধী মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ দেশজুড়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ক্রমবর্ধমান হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মানবাধিকার সংস্থাটি জানিয়েছে যে, বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা তত উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। নয়াদিল্লি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে হিন্দুদের প্রতি বৈষম্যের সমালোচনা করেছে। গত সপ্তাহে ভারত জানিয়েছে, তারা প্রতিবেশী দেশটির পরিস্থিতিতে নজর রাখছে এবং আশা করে যে সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনাগুলি দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করা হবে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান এবং শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী মহম্মদ ইউনূস ভারতের অভিযোগকে অতিরঞ্জিত বলে উল্লেখ করেছেন।
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার হিন্দু যুবক জয় মহাপাত্রের মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসে। পরিবারের অভিযোগ ছিল জয়কে পিটিয়ে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। ভারতবিরোধী কট্টরপন্থী নেতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হিংসা সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলায় ২৭ বছর বয়সী দীপু দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে স্থানীয় ইসলামপন্থী জনতা মারধর করে হত্যা করে, মৃতদেহ গাছ থেকে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এখানেই থেমে থাকেনি সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হিংসা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ৪০ বছর বয়সী দোকানি শরৎমণি চক্রবর্তীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করা হয়। সেই আঘাতের কারণে তিনি মারা যান। তাঁকে হত্যার কয়েক ঘণ্টা আগে যশোর জেলায় ৪৫ বছর বয়সী রানা প্রতাপকে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রতাপের দেহের পাশে সাতটি গুলির খোল পাওয়া গিয়েছে। কয়েকদিন আগে ৫০ বছর বয়সী খোকন চন্দ্র দাসকে নৃশংসভাবে আক্রমণ করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। অন্যান্যদের মধ্যে রয়েছেন ভালুকার একটি পোশাক কারখানায় সহকর্মীর হাতে নিহত ৪০ বছর বয়সী বাজেন্দ্র বিশ্বাস, রাজবাড়ীতে গণপিটুনির শিকার হন ২৯ বছর বয়সী অমৃত মণ্ডল। সমীর দাসের মৃত্যুর মতো ঘটনা ফের প্রমাণ করছে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রশ্নে বাস্তব উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।