পুজোয় পেট্রাপোল দিয়ে আসবে বাংলাদেশি ইলিশ?
আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত, কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিল্লি আসছেন কিনা তা এখনও ঝুলে রয়েছে। আর এই আবহেই প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করতে ভারত থেকে ঢাকায় গিয়েছে উচ্চপর্যায়ের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল। সোমবার (১৭ অগাস্ট) প্রতিনিধিদলটি ঢাকায় পৌঁছয়। তিনদিন তারা বাংলাদেশে থাকবেন বলে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশন বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এখন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ঠিক এই সময় ঢাকা সফরে ভারতের শীর্ষ শিল্প-বাণিজ্য সংগঠন কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি বা সিআইআই-এর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা, যা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এই প্রতিনিধিদলের সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে দুই দেশের শিল্প ও বাণিজ্য মহল। এই সফরে বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্যিক বাধা কমানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
CII দল এখন ঢাকায়
সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা খুঁজতে ১৯ অগাস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করছে ভারতের কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) উচ্চপর্যায়ের এই ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলটি। কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলে ভারতের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের ১৪ জন ব্যবসায়ী নেতা রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন- ভারত বায়োটেক, ইনফ্রাভিশন ফাউন্ডেশন, গোদরেজ ইন্ডাস্ট্রিজ, অরবিন্দ লিমিটেড, এলএমডব্লিউ গ্লোবাল, মাহিন্দ্রা গ্রুপ, লারসেন অ্যান্ড টুব্রো (এলঅ্যান্ডটি), ফোর্বস মার্শাল, নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড, অ্যাপোলো হাসপাতাল ও ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের প্রতিনিধি। এছাড়া সিআইআই সচিবালয়ের কর্মকর্তারাও প্রতিনিধিদলে রয়েছেন।
সিআইআই জানিয়েছে, সফরটির লক্ষ্য ভারত ও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ খুঁজে বের করা। এই সফরে ভারতীয় প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, বিদেশ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, এফবিসিসিআই এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিডার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন।
ইলিশ নিয়ে কথা
এদিকে গত কয়েকবছর ধরেই পুজোর সময় বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রফতানি হয় ভারতে। হাসিনার সময় তো বটেই এমনকি ইউনূসের সময়ও সেই প্রথা বজায় ছিল। কিন্তু তারেক জমানায় কি সেই ধারা বজায় থাকবে? পুজোয় যাতে ভারতীয় বাজারে পদ্মার ইলিশ আসে তার প্রস্তুতি ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা পশ্চিমবঙ্গের মানুষের চিরকালীন। প্রতি বছর রাজ্যের মানুষ পদ্মা, মেঘনার ইলিশের আশায় পথ চেয়ে থাকেন। গতবছর উথাল-পাতাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও ঠিক পুজোর আগে ৫০০ মেট্রিক টন পদ্মার ইলিশ পেয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ। কিছুটা পেয়েছিল ত্রিপুরাও। এবছর যাতে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে ইলিশ আমদানি করা যায় সেজন্য বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল ঢাকায় গিয়েছে। আমদানিকারকদের এই প্রতিনিধিদলটি ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ দ্বিবেদীর সঙ্গে দেখা করার পাশাপাশি সেদেশের বাণিজ্যসচিবের সঙ্গেও বৈঠক করবে। এই বৈঠকে পুজোর আগে পশ্চিমবঙ্গে পর্যাপ্ত পদ্মার ইলিশ রফতানির আবেদন জানানো হচ্ছে।
আমদানিকারক সংগঠনের দাবি
আমদানিকারক সংগঠনের কর্তা অতুলচন্দ্র দাস জানিয়েছেন, 'আশা করছি বৈঠক ফলপ্রসূ হবে।' উল্লেখ্য, তিস্তা জলবণ্টন ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের জেরে ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ ভারতে ইলিশ রফতানি বন্ধ রেখেছিল। পরে ২০১৯ সাল থেকে দুর্গাপুজো উপলক্ষে সীমিত পরিসরে ইলিশ রফতানি শুরু হয়, যা মূলত পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আসে। দুর্গাপুজো উপলক্ষে বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসাবে তারপর থেকে প্রতিবছরই বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আসছে পশ্চিমবঙ্গে। বনগাঁর পেট্রাপোল দিয়েই ইলিশ আসে এপারে। এবারও সেই চেষ্টা চলছে। প্রসঙ্গত, গতবার বাংলাদেশ সরকার সে দেশের ৩৭টি সংস্থাকে ৫ অক্টোবরের মধ্যে ১২০০ টন ইলিশ রফতানির অনুমোদন দিয়েছিল।
পশ্চিমবঙ্গের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ গতবারও চেষ্টা চালিয়েছিলেন যাতে করে বেশি ইলিশ আনানো যায়। এবারও সেই চেষ্টা চলছে। পদ্মার ইলিশ এক কেজি ওজনের বেশি হলেই এখানে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতি কেজি দাম ছুঁয়ে যায়। এবার এখানে দিঘা, নামখানায় ইলিশের জোগান যথেষ্ট। কিন্তু বড় ইলিশের দেখা নেই। এখনও পর্যন্ত এক কেজি ওজনের ইলিশ এসেছে একেবারে নামমাত্র। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দা, রাজ্য ফিশ ট্রেডার্স ও ট্রলার মালিকদের সংগঠনের এক কর্তা বিজন মাইতি জানিয়েছেন, 'গত পাঁচ-ছ’দিন খুবই ভালো ইলিশ উঠেছে। তবে আবহাওয়া খারাপ থাকার দরুন বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত সমুদ্রে যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তারপর যদি ভালো পরিমাণ মাছ ওঠে তো বলতে হবে গতবারের চেয়ে জোগান বেশি। না হলে গতবারের মতোই থাকবে।' এবার ইলিশের জন্য যে বৃষ্টি দরকার তাও রয়েছে। তাই আশায় রয়েছেন মৎস্যজীবীরা। কিন্তু রাজ্যে বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা চিরকালীন। সেই চাহিদা মিটবে কি না, মিটলে সেটা কতখানি তা ঠিক হয়ে যাবে চলতি সপ্তাহে ঢাকায় বৈঠকের পর।