
বাংলাদেশে উড়ছে তালিবানি ও ইসলামিক স্টেটের পতাকাবাংলাদেশের রাস্তায় প্রকাশ্যে উড়ছে সাদা-কালো 'কালেমা' পতাকা। এই ধরনের পতাকা আল-কায়দা এবং ইসলামিক স্টেটের মতো সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত। এই ঘটনায় বাংলাদেশজুড়ে হইচই পড়েছে। প্রতিবেশী ভারতের জন্যও উদ্বেগের কারণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশে বিদেশি চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো যে ক্রমশ মাথা তুলছে তা স্পষ্ট।
আরবিতে লেখা এই কালেমা পতাকাগুলো সবার আগে ১৭ জুন ঢাকার একটি ফ্লাইওভারে দেখা যায়। ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরপর থেকে মীরপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ফরিদপুর জুড়ে এই পতাকাগুলো দেখা গেছে। একই ধরনের পতাকা লাগিয়ে বাইক মিছিল ও র্যালির দৃশ্যও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে উদ্বিগ্ন পুলিশ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।
কালেমা পতাকা কী?
বাংলাদেশে দুটি স্বতন্ত্র পতাকা দেখা গেছে। উভয় পতাকাতেই আরবি লেখা রয়েছে - 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ', যার অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনও উপাস্য নেই। এটি সাদা পতাকায় কালো রঙে লেখা। অন্যটিতে, কালো পতাকায় সাদা রঙে লেখা কালেমা পতাকা।
প্রথমটি হল তালিবানের পতাকা। অন্যটি আল-কায়দা, ইসলামিক স্টেট এবং হিজবুত তাহরিরের মতো সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো ব্যবহার করছে। হিজবুত তাহরির একটি নিষিদ্ধ সংগঠন যা ২০২৪ সালের অস্থিরতার পর দ্রুত তার কার্যক্রম প্রসারিত করেছে।
গত বছর হিজবুত তাহরির ঢাকার প্রধান মসজিদের সামনে 'খিলাফতের জন্য পদযাত্রা' আয়োজন করেছিল, যাতে ২,০০০-এরও বেশি মানুষ সমবেত হয়েছিল। ২০০৯ সালে পূর্ববর্তী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে নিষিদ্ধ ঘোষিত এই সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশ্বব্যাপী খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য চাপ দিয়ে আসছে।
তবে, এই সমাবেশগুলো এবং কালেমা পতাকার আকস্মিক বিস্তারের পিছনে হিজবুত তাহরিরের হাত আছে কি না, তা জানা যায়নি। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
Bangladesh 🇧🇩 is going backwards fast with these white TTA flags everywhere. Pushing extremism will only bring more poverty, violence and failure to your country. Stop copying Taliban style and focus on education and progress instead of destroying your future with blind… pic.twitter.com/hpUfA2u3zX
— True Patriot (@TruePatriot7868) June 29, 2026
কিছু কিছু জায়গায় মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের 'তাওহিদী জনতা' হিসেবে পরিচয় দিয়েছে, যা ইসলামী একেশ্বরবাদকে রক্ষা করার লক্ষ্যে গঠিত একটি ইসলামপন্থী গোষ্ঠী। গত দুই সপ্তাহে এই ব্যানারে বেশ কয়েকটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মজার বিষয় হল, একটি মিছিলে প্যালেস্তাইনের পতাকাও দেখা গেছে।
গত বছর বাংলাদেশে মাজার, সুফি প্রতিষ্ঠান ও বাউলদের সমাবেশে হামলায় ‘তওহিদী জনতা’র সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগকারী গোষ্ঠীগুলো জড়িত ছিল।

সম্প্রতি ভারতে নিযুক্ত ইজরায়েলি দূত রুভেন আজার বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে হামাসের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা নিয়ে সতর্ক করেছেন। প্যালেস্তাইনের জনগণের প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সহানুভূতি রয়েছে, এটা কোনও গোপন বিষয় নয়। তবে বিদেশি জিহাদি বয়ানকে প্রশ্রয় দেওয়া উদ্বেগের বিষয় বলে আজার সতর্ক করেছেন।
গত বছর হামাস নেতা এবং পাকিস্তান-ভিত্তিক সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যোগাযোগের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে।
পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাক্তন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, এই অভিযানের প্ছনে কারা রয়েছে এবং এর উদ্দেশ্য কী, তা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর চিহ্নিত করা উচিত।
গত কয়েকদিনে ফেসবুক এবং অনলাইনে কালেমা পতাকা দেখা গেছে। ফেসবুকের বেশ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক পেজও এই পতাকাগুলোর প্রচার করেছে।

দিনাজপুরে একই ধরনের একটি মিছিলের আয়োজকরা ফেসবুকে পোস্ট করে জানিয়েছেন, তাদের এই পদযাত্রা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ।
আয়োজকদের একজন মুফতি আবু বকর সিদ্দিকী গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা মানুষের কাছে ইসলামকে তুলে ধরতে এবং তাদের অন্তরে কালিমা গেঁথে দিতে চাই। আমরা আরও চাই, মানুষ যেন ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে সৃষ্ট উন্মাদনা পরিহার করে।”
হেফাজতে ইসলামের নেতা মুফতি হারুন ইজহারের একটি তারিখবিহীন ভিডিও সামনে এসেছে, যেখানে তাকে যুবকদের সর্বত্র কালেমা পতাকা লাগানোর জন্য আহ্বান জানাতে শোনা যায়।
ভিডিওটিতে হারুন ইজহার যুক্তি দেন যে, যদি এই ধরনের পতাকাকে জঙ্গিবাদের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকাও নামিয়ে ফেলা উচিত। ভিডিওতে ইজহার বলেন, "এটাই যদি জঙ্গিবাদ হয়, তাহলে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকাও নামিয়ে ফেলতে হবে।"
ভারতের কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?
সম্প্রতি, ভারত-বিরোধী বক্তব্যের জন্য পরিচিত বাংলাদেশের সাংসদ হাসনাত আবদুল্লাহকে আল-কায়েদার পতাকা হাতে দেখা গেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান নেতা আবদুল্লাহ সম্প্রতি সেভেন সিস্টার্সকে ভারত থেকে "বিচ্ছিন্ন" করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
এখনও পর্যন্ত কোনও পদক্ষেপ নেওয়া না হলেও, বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। হঠাৎ কালেমা পতাকা প্রদর্শনের পিছনের উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ৪,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ অরক্ষিত সীমান্ত থাকায় ভারতের জন্য এই ঘটনাগুলো উদ্বেগজনক। পূর্ববর্তী মুহাম্মদ ইউনুস সরকারের আমলে উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো অবাধে বিচরণ করার সুযোগ পেয়েছিল। বেশ কয়েকজন কট্টরপন্থী ইসলামপন্থী কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিল। হিজবুত তাহরিরের মতো সংগঠনগুলো যুবকদের মধ্যে সদস্য সংগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং তাদের প্রভাব বিস্তার করেছিল।
বাংলাদেশে ইসলামপন্থী চরমপন্থার এই পুনরুত্থান পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদ হক সতর্ক করেছেন, এই অভিযানটি কোনও চরমপন্থী গোষ্ঠীর নিজেদের উপস্থিতি ও প্রভাব জানান দেওয়ার একটি ‘মহড়া’ হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এই নতুন চ্যালেঞ্জটি কীভাবে মোকাবিলা করে, তা দেখার বিষয়। এই চ্যালেঞ্জের আন্তঃসীমান্ত প্রভাবও থাকতে পারে।