মঙ্গলবার দলের যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফ সোহেল আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা করলেন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)তে ভাঙন অব্যাহত। জামাত-ই-ইসলামির সঙ্গে জোটকে কেন্দ্র করে যে অস্বস্তি ও বিদ্রোহের সুর তৈরি হয়েছিল, তা আরও প্রকট হল। মঙ্গলবার দলের যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফ সোহেল আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা করলেন। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি জানিয়ে দেন, এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক রাখছেন না।
‘জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে আমার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রসঙ্গে’; এই শিরোনামে দেওয়া পোস্টে আরিফ সোহেলের অভিযোগ, নতুন গণরাজনীতি নির্মাণ, রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা এবং জুলাই আন্দোলনের গণশক্তিকে সংগঠিত করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে এনসিপি। তাঁর কথায়, এই ব্যর্থতার ফলেই দলটি প্রতিষ্ঠিত পুরনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হয়েছে এবং পুরনো ক্ষমতার রাজনীতির গণ্ডিতেই ঢুকে পড়েছে।
আরিফ লেখেন, 'আমি এবং আমার কমরেডরা গণমানুষের প্রকৃত গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের যে লড়াই শুরু করেছিলাম, তা চালিয়ে যেতে হলে এই মুহূর্তে প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে গিয়ে আবার গণমানুষের কাতারে দাঁড়ানো জরুরি।' সেই যুক্তিতেই তিনি এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও কেন্দ্রীয় কমিটির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান। একই সঙ্গে প্রাক্তন সহকর্মীদের শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন তিনি, এই আশায় যে তাঁরা ভবিষ্যতে আবার ‘নতুন রাজনীতি নির্মাণের লড়াইয়ে’ ফিরবেন।
আরিফ সোহেলের পদত্যাগ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জামাত-ই-ইসলামির সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী জোটের খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই দলজুড়ে শুরু হয়েছে বিদ্রোহ ও অসন্তোষ। রবিবার বিকেলেই এই জোটের কথা জানাজানি হতেই দল ছাড়ার ঘোষণা করেন দুই গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী; তাসনিম জারা এবং তাজনূভা জাবীন। এর পরই এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরত তাবাসসুম জানান, তিনি ভোটের সময় দলের সব কার্যক্রম থেকে নিজেকে নিষ্ক্রিয় রাখবেন। ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে নুসরত স্পষ্ট করে লেখেন, এনসিপির জন্মলগ্নে যে স্বপ্ন, আদর্শ ও রাজনৈতিক ভাষা তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল, বর্তমান বাস্তবে তার সঙ্গে তাঁর অবস্থানের ফারাক তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, নুসরত কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাবেন বলে মনে করা হচ্ছিল। তাঁর মতো একজন সম্ভাব্য প্রার্থীর এমন সিদ্ধান্ত দলকে যে বড় ধাক্কা দিয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। একই দিনে এনসিপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় নেতা আজাদ খান ভাসানী। তাঁর অভিযোগ, নীতিগত দৃঢ়তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এনসিপি, দলটি নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তুলতে পারেনি।
প্রাক্তন উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের অবস্থানও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এনসিপি-জামাত জোটের প্রার্থী হিসেবে তিনি নির্বাচনে দাঁড়াবেন না। যদিও তাঁর কাছে প্রস্তাব এসেছিল বলে স্বীকার করেছেন মাহফুজ। ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, ঢাকার কোনও আসনে জোটের প্রার্থী হওয়ার চেয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান ও আদর্শ ধরে রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অগাস্ট আন্দোলনের সময় যাঁকে ‘গণঅভ্যুত্থানের মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল, সেই মাহফুজের এই সিদ্ধান্ত এনসিপির জন্য নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর।
মাহফুজের বক্তব্যে এটাও স্পষ্ট যে, নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক লড়াই বা সামাজিক পুনর্মিলনের যে আদর্শ তাঁরা তুলে ধরেছিলেন, এনসিপি আদৌ তা গ্রহণ করতে পেরেছে কি না, তাই নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
এ দিকে দলের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ সামাল দিতে মাঠে নেমেছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, জামাতের সঙ্গে কোনও নীতিগত বোঝাপড়া হয়নি, এটি শুধুই কৌশলগত জোট। তবে দলেরই একটি বড় অংশ এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। তাদের যুক্তি, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা একটি দলের সঙ্গে জোট মানেই স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
সব মিলিয়ে, জামাত-এনসিপি জোটকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টির ভিতরে যে ফাটল ধরেছে, তা ক্রমশ গভীর হচ্ছে। একের পর এক পদত্যাগ, নিষ্ক্রিয়তার ঘোষণা এবং প্রকাশ্য সমালোচনায় এনসিপির রাজনৈতিক ভবিষ্যত প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড়িয়ে। নতুন বাংলাদেশের দাবি নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই দল কি শেষ পর্যন্ত পুরনো রাজনীতির জটিল ধাঁধাতেই হারিয়ে যাবে? সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে।