
'রাম' নিয়ে উত্তাল বাংলাদেশসিজন'স বেস্ট কমপ্লিমেন্টস' হিসাবে নেপালে আম পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তরফে ১৭৫০ কেজি আম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে। তারেক রহমানের পাঠানো আম নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে বিলিবন্টন হয়ে গেলেও এখনও দিল্লিতে তা পৌঁছয়নি। ভারতকে আদৌ আম পাঠানো হচ্ছে কিনা তাও স্পষ্ট করেনি ঢাকা। যদিও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতি বছর ভারতে রাষ্ট্রনেতাদের জন্য আম পাঠাতেন। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনূসও এই নিয়মের অন্যথা করেননি। এরমধ্যেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে রবিবার দিল্লির বিমানবন্দরে বাধা দেওয়ার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ঢাকায় ভারপ্রাপ্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পবনকুমার বঢ়েকে তলব করেছে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক। এদিকে ভারতকে এড়িয়ে চলতি মাসেই চিন সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে যখন এই দোলাচল তৈরি হয়েছে তখন নতুন করে বিতর্ক দেখা দিল ভগবান রামের মূর্তিকে ঘিরে।

বাংলাদেশের উত্তরের জেলার গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দিরে বিশ্বের বৃহত্তম শ্রীরামের মূর্তি নির্মাণ হচ্ছিল। সেই কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। মন্দিরের উপদেষ্টা শ্রী শ্যামল কুমার মহন্ত নিজেই সেকথা জানিয়েছেন। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের মুদ্রায় প্রায় ২২ কোটি টাকা খরচ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য এক বৃহৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছিল। ৮১ ফুট উচ্চতার রাম মূর্তির পাশাপাশি প্রায় ৫০ ফুট উচ্চতার কৃষ্ণ (Lord Krishna) মূর্তি এবং ৩০ ফুট উচ্চতার শিব (Lord Shiva) মূর্তি তৈরির কাজ শুরু হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিজস্ব ধর্মের দেবতাদের মূর্তি তৈরির বিরুদ্ধে পথে নামে মৌলবাদীরা। এরপরেই রাম মূর্তি তৈরির কাজ স্থগিত হয়ে যায়।
শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দিরের উপদেষ্টা শ্যামল কুমার মহন্ত জানিয়েছেন, 'সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার স্বার্থে মন্দির কমিটি আপাতত রাম মূর্তি স্থাপনের কাজ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা সমালোচনার মধ্য থাকতে চাই না। কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হোক, আমরা সেটাও চাইব না। এ দেশে সবাই নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। তবে কোনও কিছু করতে হলে ধর্মের প্রতিই সম্মান রেখেই করতে হবে। ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার। এ নীতিতে আমরা সবাই বিশ্বাসী।' কিন্তু বাংলাদেশ যদি সবার হয়, তাহলে হিন্দুরা কেন দেব মূর্তি তৈরি করতে পারবেন না, সেই প্রশ্ন উঠছে।
সনাতনীদের অভিযোগ, রামমূর্তি নির্মাণ শুরুর পর থেকেই ইসলামপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলি নানাভাবে বাধা দিচ্ছিল। মন্দিরের অর্থায়ন নিয়েও তদন্তের দাবি তোলা হয়। শেষ পর্যন্ত তীব্র বিরোধিতা ও চাপের মুখে মন্দির কমিটি মূর্তি নির্মাণ স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। এই বিষয়ে মুখ খুলেছেন বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা ও মানবাধিকারকর্মী তসলিমা নাসরিন। তিনি সামাজিকমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ প্রকাশ করেছেন। তিনি ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন।
তসলিমা নাসরিন বলেন, ধর্মীয় স্বাধীনতা যদি একটি মৌলিক অধিকার হয়, তবে তা সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু—উভয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। তাঁর প্রশ্ন, দেশে নতুন নতুন মসজিদ নির্মিত হতে পারলে একটি রামমূর্তি বা মন্দির নির্মাণ নিয়ে এত আপত্তি কেন? তসলিমা আরও দাবি করেন, প্রকল্পটিকে ঘিরে যে ধরনের হুমকি, উস্কানিমূলক বক্তব্য এবং বিদ্বেষমূলক পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, কোনও মতভেদ বা ধর্মীয় অবস্থান অন্য সম্প্রদায়ের উপাসনালয় বা ধর্মীয় প্রকল্পে বাধা দেওয়ার কারণ হতে পারে না। পলাশবাড়ি এলাকায় অতীতে হিন্দু মন্দিরে হামলা এবং প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। নতুন করে এই প্রকল্প স্থগিত হওয়ার ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থার প্রশ্ন আরও জোরালো হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
রামের মূর্তির অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে বাংলাদেশের নানা প্রান্তে। এই ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করেন। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তাঁরা। ‘সচেতন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ’-এর ব্যানারে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন ছাত্রনিবাসের বাসিন্দারাও অংশ নেন। পরে মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে শাহবাগ মোড়ে পৌঁছয়। এরপর তাঁরা রাস্তা অবরোধ করে প্রতিবাদ জানান।

সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক রাম প্রসাদ সাহা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। তাঁর অভিযোগ, কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ভগবান রামকে নিয়ে গুজব ছড়িয়ে ধর্মীয় উস্কানি দেওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, 'শ্রী রামচন্দ্র আমাদের কাছে অবতার। তাঁর প্রতিকৃতিতে জুতা নিক্ষেপের ঘটনা সনাতন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে গভীর আঘাত হেনেছে। আমরা ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে চাই। কিন্তু কিছু গোষ্ঠী বিভেদ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।' সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শিক্ষার্থী নেতা দীপজয় সরকার দীপ্ত ও সুদীপ্ত প্রামাণিক। তাঁরা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে বারবার বৈষম্য দেখা যায়। একই সঙ্গে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবিও তোলেন তাঁরা। সুদীপ্ত প্রামাণিক বলেন, 'নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু পরে সেগুলোর অনেকটাই বাস্তবায়িত হয় না। আমরা চাই, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হোক।' তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আগামী শুক্রবার আরও বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি
বিক্ষোভকারীরা সমাবেশ থেকে কয়েকটি দাবি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে রয়েছে—গাইবান্ধার ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সরকারের আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ, উগ্রবাদী কার্যকলাপ দমনে কার্যকর উদ্যোগ এবং গাইবান্ধায় প্রস্তাবিত ভগবান রামের বৃহত্তম মূর্তি নির্মাণের কাজ পুনরায় শুরু করা। ঘটনাটি নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।