scorecardresearch
 

Bangladesh Economy: আর মাত্র ৫ মাস, শ্রীলঙ্কার মতো 'দেউলিয়া' পথে বাংলাদেশও?

আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বাংলাদেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং এর আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এ কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। আসন্ন অর্থনৈতিক সংকট থেকে দেশকে বাঁচাতে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে
হাইলাইটস
  • বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে
  • আমদানির জন্য মাত্র পাঁচ মাসের ডলার বাকি
  • সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলো কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে

ভারতের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন। দেশের মুদ্রার ব্যাপক পতন হয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শূন্য হয়ে পড়েছে। এদিকে প্রতিবেশী বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, কাঁচামাল ও জ্বালানি, পণ্য পরিবহন ইত্যাদির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪৪ শতাংশ।

বাংলাদেশের সংবাদপত্রের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় যে গতিতে বেড়েছে সে অনুযায়ী রফতানি আয় বাড়েনি। এ কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বেড়েছে।

গত কয়েক মাস ধরে বাণিজ্য ঘাটতি ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে এবং বাংলাদেশ আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য দেশে জমা হওয়া ডলার বিক্রি করে চলেছে।

মাত্র পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় বহন করতে পারবে বাংলাদেশ
 বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। দেশে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অবশিষ্ট আছে, তা দিয়েই আগামী পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। বৈশ্বিক বাজারে দাম আরও বাড়লে ফলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় আরও বাড়বে এবং পাঁচ মাসের আগেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফুরিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের চাপ বাড়ছে 
বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) ক্রমাগত বাংলাদেশকে তার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সঠিকভাবে গণনার জন্য চাপ দিচ্ছে। বাংলাদেশ যদি আইএমএফের এই নির্দেশ কঠোরভাবে মেনে চলে, তাহলে রফতানি ঋণ তহবিল, সরকারি প্রকল্প, শ্রীলঙ্কাকে দেওয়া পরিমাণ এবং সোনালি ব্যাঙ্কে (বাংলাদেশের সরকারি ব্যাঙ্ক) আমানত বাদ দিয়ে বাকি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাব করতে হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এই হিসাবের পর বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৭ বিলিয়ন ডলার কমে যাবে।

 

 

আশার আলো
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ার মধ্যেও বাংলাদেশ আশার আলো দেখছে। বাংলাদেশে রফতানি থেকে আয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। অভ্যন্তরীণ বস্ত্র বাণিজ্য, কৃষিপণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি থেকে বাংলাদেশের আয় চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল মাসে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে রফতানি আয়ও প্রায় এক ডলার।

বাংলাদেশ যদি নিশ্চিত করে যে রফতানিতে কোনো দুর্নীতি হয়নি এবং কোনো অবৈধ পন্থা অবলম্বন না করা হয়, তাহলে রফতানি থেকে বৈদেশিক আয় বাড়বে। আমদানি ব্যয় বাড়লেও এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস এড়াবে।

সরকারের প্রচেষ্টা
 এদিকে, বর্তমান ডলার সংকট কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের ব্যাঙ্ক বিলাসবহুল পণ্য আমদানি রোধে বিভিন্ন প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে শেখ হাসিনা সরকার। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা তুলনামূলকভাবে কম জরুরি প্রকল্পগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত করার কথাও বিবেচনা করছেন।

অর্থনীতিবিদরা সরকারের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন এবং বলেছেন যে সংকট আরও খারাপ হওয়ার আগে জরুরি ভিত্তিতে আরও কিছু কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

বাংলাদেশের আমদানি বাড়ছে 
বাংলাদেশ তার শিল্পের কাঁচামালের জন্য আমদানির উপর নির্ভরশীল এবং শিল্পের বেশিরভাগ কাঁচামাল আমদানি করে। এরপর সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় ভোগ্যপণ্য। বাংলাদেশের আমদানি তালিকায় জ্বালানি তেলের অবস্থান পঞ্চম। ২০২১-২২  অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ের মধ্যে ২২  বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের শিল্প কাঁচামাল আমদানি করা হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৪  শতাংশ বেশি। ২০২১-২২  অর্থবছরের প্রথম তিন ত্রৈমাসিকে জ্বালানীর ব্যয় ৫.৪ বিলিয়ন ডলার  বেড়ে যাওয়ায় দেশটির জ্বালানি আমদানিতে ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৮৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এছাড়াও, ভোগ্যপণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪১ শতাংশ, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪২ শতাংশ এবং উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত পণ্য/যন্ত্রের আমদানি ৫০ শতাংশ বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে, ২০২২ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪৪ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে ব্যাঙ্কাররা বলছেন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি মানেই আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি নয়। সাম্প্রতিক উত্থান বিশ্ব বাজারে বর্ধিত শিপিং খরচ এবং ভোগ্যপণ্যের বিশাল চাহিদার কারণে যা শীঘ্রই কমার সম্ভাবনা নেই। ব্যাঙ্কররা আরও বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উচিত আমদানি পণ্যের ওপর কড়া নজর রাখা যাতে আমদানি-রফতানির আড়ালে অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

বিলাস দ্রব্যের ওপর কঠোর বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক
 বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ও সরকার দেশকে যেকোনো সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকট থেকে রক্ষা করতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রেখেছে। বিলাসবহুল গাড়ি এবং ইলেকট্রনিক হোম অ্যাপ্লায়েন্স আমদানির জন্য ওপেনিং লেটার অফ ক্রেডিট (এলসি) এর নগদ মার্জিন ৭৫  শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। এখন বিদেশ থেকে ১ কোটি টাকার গাড়ি আমদানির আগে একজন ব্যবসায়ীকে ৭৫ লাখ টাকা জমা দিতে হবে। এসব উদ্যোগে আমদানি ব্যয় কমবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক।

 

 

রফতানি বাড়লেও কমেছে বিদেশি মুদ্রা দেশে আসা 
কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব কাটিয়ে বাংলাদেশের রফতানি ক্ষেত্র এগিয়ে যাচ্ছে । ২০২২ অর্থবছরের জন্য দেশের বার্ষিক রফতানির  লক্ষ্যমাত্রা মাত্র দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) পূরণ হয়েছে। ২০২২ সালের প্রথম দশ মাসে বাংলাদেশ ৪৩.৩৪  বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রফতানি করেছে, যখন বার্ষিক রফতানি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৩.৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই সময়ে রফতানি  আগের বছরের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে।

কিন্তু এই সময়ে বৈদেশিক আয় ১৬  শতাংশ কমেছে। ব্যাঙ্কিং খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, কোভিড-১৯-এর কারণে যখন যোগাযোগ পরিষেবা ব্যাহত হয়েছিল, তখন সব প্রবাসী বাংলাদেশি বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠাতেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। ব্যাঙ্ক এবং খোলা বাজারে ডলারের দামের মধ্যে পার্থক্য ৮  টাকা ছাড়িয়ে গেছে, প্রবাসীদের বাড়িতে অর্থ  পাঠানোর জন্য অবৈধ উপায় বেছে নিতে বাধ্য করেছে, যার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা হ্রাস পাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের  তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসীরা ২০২২ সালের জুলাই-এপ্রিল মেয়াদে ১৭.৩ বিলিয়ন ডলার প্রেরণ করেছে, যা এক বছর আগের একই সময়ে ২৬.৬ বিলিয়ন ডলার ছিল।

চাপে বাংলাদেশের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক
 বাণিজ্য ঘাটতির কারণে বাংলাদেশকে তার রিজার্ভ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৫.২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে, যার কারণে তা হ্রাস পাচ্ছে। ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশের মুদ্রা টাকার দামও কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক  টাকা-ডলার বিনিময় হার ৮৬.৭ টাকা নির্ধারণ করেছে এবং ব্যাঙ্কগুলো আমদানিকারকদের প্রতি ডলারের জন্য ৯৫ টাকা করে নিচ্ছে। এতে ভোগ্যপণ্যসহ আমদানি পণ্যের দাম বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বর্তমান চাপ উদ্বেগের বিষয়। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সমস্যাসহ বেশ কিছু সমস্যার কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির কারণে মানুষ চাপে পড়েছে। তিনি বলেন, "আমি বুঝতে পারছি না যে এমন পরিস্থিতিতে সরকার কীভাবে হাই গ্রোথ  আশা করছে।"