
একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ডার্ক প্রিন্স’ নামে পরিচিত তারেক রহমান এখন দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে। শুক্রবারের নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পর তিনি সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উঠে এসেছেন। ফল ঘোষণার আগেই ভারত দ্রুত অভিনন্দন জানানোয় স্পষ্ট, দিল্লি নতুন সমীকরণে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ খুঁজছে।
ভারতের দৃষ্টিতে, তারেকের বিএনপি বরাবরই জামায়াতে ইসলামীর তুলনায় তুলনামূলকভাবে উদার ও গ্রহণযোগ্য শক্তি। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর দুই দেশের সম্পর্ক যে টানাপোড়েনে পড়েছিল, তা মেরামতের সম্ভাবনা এখন নতুন করে আলোচনায়।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বার্তা
লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে তারেক রহমানের অবস্থান কিছুটা পাল্টেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। তিনি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা বলেছেন, যেখানে ভারত, চিন ও পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক শক্তির থেকে সমদূরত্ব বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাকিস্তান ও চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায় দিল্লির উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে তারেকের ভারসাম্যের বার্তা ভারতের কাছে ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সম্পর্কের দ্বৈত বাস্তবতা
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার সীমান্ত, বিস্তৃত বাণিজ্য, বিদ্যুৎ বিনিময় ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দুই দেশ একে অপরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর বাংলাদেশের একাংশ, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভারত সম্পর্কে সন্দেহের মনোভাব তৈরি হয়েছে। ফলে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন তারেকের কাছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
ভারত ইতিমধ্যে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। খালেদা জিয়ার অসুস্থতার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সহানুভূতি প্রকাশ এবং পরবর্তীতে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর, সবই সম্পর্ক মেরামতের ইঙ্গিত। নির্বাচনে জয়ের পর মোদীর শুভেচ্ছা বার্তাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
অন্তর্ভুক্তিমূলক বার্তা ও সংখ্যালঘু প্রশ্ন
দেশে ফিরে তারেক রহমানের ভাষণে আগের তুলনায় সংযমী সুর লক্ষ করা গেছে। 'ধর্ম ব্যক্তিগত, রাষ্ট্র সবার', এই বার্তা দিয়ে তিনি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন। সাম্প্রতিক হিংসার প্রেক্ষিতে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
তবে সীমান্তে গুলিবর্ষণ ও তিস্তা নদীর জল বণ্টন ইস্যুতে তিনি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। বিএনপির ইশতেহারে ভারতের সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও জল ও সীমান্ত প্রশ্নে ‘ন্যায্য হিস্যা’র কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে।
অন্ধকার অতীতের ছায়া
তারেক রহমানের অতীত ভারতের কাছে সম্পূর্ণ স্বস্তিদায়ক নয়। ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি শাসনের সময় দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সেই সময়ে পাকিস্তান-ঘনিষ্ঠ জামাত ছিল বিএনপির বন্ধু।
ভারত অভিযোগ তোলে, বাংলাদেশে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহীদের আশ্রয় দেওয়া হচ্ছিল। তারেক তখন কোনও আনুষ্ঠানিক পদে না থাকলেও ‘হাওয়া ভবন’ থেকে প্রভাব বিস্তার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০০৪ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্র মামলাতেও তার নাম জড়ায়। ২০০৫ সালে একটি মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় তাকে ‘ডার্ক প্রিন্স’ বলা হয়। যদিও ২০২৪ সালে হাসিনার পতনের পর তার বিরুদ্ধে থাকা একাধিক মামলা খারিজ হয়ে যায়।
সামনে কোন পথ?
প্রায় দেড় দশক ক্ষমতার বাইরে থেকেও তারেক বিএনপিকে সংগঠিত রেখেছেন। দেশে ফেরার পর তাঁর বক্তব্যে এক বাস্তববাদী ও সংস্কারমুখী নেতৃত্বের ইঙ্গিত মিলছে।