
তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতি গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের সাক্ষী হল। প্রায় ৩৫ বছর পরে কোনও পুরুষের হাতে যেতে চলেছে বাংলাদেশের শাসনের দায়িত্বভার। নির্বাচনের এই ফলাফল প্রত্যাবর্তন, সংগ্রাম এবং ক্ষমতার অলিন্দে যাওয়ার এক নয়া কাহিনি তৈরি করছে। তারেক রহমান যে কেবল দেশেই ফিরে আসেননি, জনসমর্থনের মাধ্যমে তাঁর শক্তিও প্রমাণ করেছেন, তা কার্যত স্পষ্ট।
জনসমর্থন জোরাল, তারেক তাঁর সংসদীয় আসন, ঢাকা-১৭ এবং বগুড়া-৭ উভয় আসনেই ব্যাপক ভোটে জিততে চলেছেন। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা কেবল সময়ের অপেক্ষা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দু'টি আসন জয়কে প্রায়শই ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এবার এটি ব্যক্তিগত অনুভূতি এবং আবেগের সঙ্গেও জড়িত ছিল। বগুড়া তারেকের পরিবারের পৈতৃক দুর্গ। দ্বিতীয় আসনটি থেকে দীর্ঘদিন নির্বাচনে লড়াই করেছেন তাঁর মা তথা বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। আবার ঢাকা-১৭ কে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়। দু'টিল আসনেই জয় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
তারেক রহমানের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP) সংখ্যাগরিষ্ঠা পেরিয়ে গিয়েছে। তারেকের প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।

১৭ বছর ধরে লন্ডনে নির্বাসন
তারেক রহমানের এই পদে আসার যাত্রা সহজ ছিল না। এটি শুরু হয় তাঁর দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার এবং লন্ডনে ১৭ বছরের স্ব-নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে। তিনি দেশ থেকে দূরে ছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে জড়িত ছিলেন। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি 'ডিজিটালি নির্বাসিত' বিরোধী নেতা ছিলেন। তিনি ভিডিও কল, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল মিটিংয়ের মাধ্যমে দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই সময়ে শেখ হাসিনা সরকারে তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ আনা হয়েছিল। যার জন্য তিনি সর্বদা রাজনৈতিক চাপকেই দায়ী করেছেন।
তারেক রহমানের বিরুদ্ধে প্রায় ৮৪টি মামলা ছিল। যার মধ্যে ডজন খানেক ফৌজদগারি ও দুর্নীতি সম্পর্কিত অভিযোগ। ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আইনি পরিবেশ উল্লেখযোগ্য ভাবে পরিবর্তিত হয় এবং ২০২৬ সালের প্রথম দিকে বেশিরভাগ বড় মামলা থেকে তারেক বেকসুর খালাস পান। এর মধ্যে ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলাও অন্তর্ভূক্ত ছিল। যার জন্য তাঁরে ২০১৮ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের পথ
২০২৪ সালের অগাস্চ মাসে ছাত্র বিক্ষোভের এক জোয়ারে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। এটি ছিল তারেক রহমানের জন্য নতুন রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরির এক মোড়। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। আইনি বাধা দূর হয় এবং তারেক ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় ফিরে আসেন।
২০২৬ সালে ভোটারদের সামনে যে নেতা দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁর ভাবমূর্তি ছিল ভিন্ন। তিনি নির্বাচনে ক্ষমতার চেয়ে পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কথা বেশি বলেছিলেন। তিনি দুই মেয়াদের সীমা নির্ধারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সংসদে একটি উচ্চকক্ষ তৈরির প্রস্তাব করেছিলেন এবং তাঁর সমর্থকদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তারেকের সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ?
বিজয় উদযাপনের মাঝে তারেক রহমানের আসল পরীক্ষা এখন শুরু। তাকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতি পরিচালনা করতে হবে এবং জাতিকে আশ্বস্ত করতে হবে যে গণতন্ত্র সকলের জন্য। বিশেষ করে তরুণ এবং সংখ্যালঘুদের জন্য যারা পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন। তারেক রহমানের বিজয় কেবল তাঁর ক্ষমতায় উত্থানের গল্প নয়। বরং এটি এই প্রশ্নও উত্থাপন করে, এক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী কি নতুন যুগের প্রত্যাশা পূরণের জন্য নিজেকে রূপান্তর করতে পারেন?