scorecardresearch
 

RAY Review: খোদার উপর বেশি খোদকারি ভালো নয়

যে গল্প পড়ে জেনারেশনের পর জেনারেশন বড় হয়েছে, সেখানে ইমপ্রোভাইজেশন এবং সিনেম্যাটিক স্বাধীনতার নামে এই খোদার উপর খোদকারিটা করলেও চলত। যাঁরা এ গল্প পড়েননি, তাঁদের কথা আলাদা। কারণ তাঁরা ধরতেই পারবেন না মূল গল্পের সঙ্গে এর পার্থক্য কোথায়। সে দিক থেকে দেখলে এটা দর্শকদের সঙ্গেও খানিকটা বেইমানি করা হল।

Advertisement
RAY RAY
হাইলাইটস
  • সত্যজিতের লেখা চারটি গল্প - ‘বিপিন চৌধুরীর স্মৃতিভ্রম’, ‘বহুরূপী’, ‘বারীন ভৌমিকের ব্যারাম’ আর ‘স্পটলাইট’-এর ছদ্মবেশে যে জিনিস সকলের পাতে তুলে দেওয়া হল, তাতে সত্যজিত ঘরানার এবং সাহিত্যের খুব একটা উপস্থিতি নেই।
  • সৃজিত মুখোপাধ্যায়, ভাসন বালা এবং অভিষেক চৌবে, এই তিন জন পরিচালকের হাতে সিরিজের রাশ দেওয়া হয়েছিল।
  • ইমপ্রোভাইজেশনের নামে গোটা গল্পই যদি এধার থেকে ওধার হয় তবে ভালো অভিনেতারাও আর কী করবেন! 

RAY
পরিচালক: সৃজিত মুখোপাধ্যায়, ভাসন বালা, অভিষেক চৌবে
কাস্ট: আলি ফজল, মনোজ বাজপায়ী, কে কে মেনন, গজরাজ রাও, হর্ষবর্ধন কাপুর, শ্বেতা বসু প্রসাদ
রেটি: ৩/৫

 

'জলের উপর পানি না পানির উপর জল?
বল খোদা বল খোদা বল।'

লালন ফকিরের সুরে প্রশ্নটা যে কোনও সত্যজিৎ রায়ের অনুরাগী করতে পারেন। আবার না-ও পারেন। তবে সত্যজিৎ রায় বেঁচে থাকলে তাঁর নাম নিয়ে মুক্তি পাওয়া ওয়েব সিরিজ RAY নিয়ে হয়তো অবশ্যই এই প্রশ্নটা করতেন। সত্যজিতের লেখা চারটি গল্প - ‘বিপিন চৌধুরীর স্মৃতিভ্রম’, ‘বহুরূপী’, ‘বারীন ভৌমিকের ব্যারাম’ আর ‘স্পটলাইট’-এর ছদ্মবেশে যে জিনিস সকলের পাতে তুলে দেওয়া হল, তাতে সত্যজিত ঘরানার এবং সাহিত্যের খুব একটা উপস্থিতি নেই।

সৃজিত মুখোপাধ্যায়, ভাসন বালা এবং অভিষেক চৌবে, এই তিন জন পরিচালকের হাতে সিরিজের রাশ দেওয়া হয়েছিল। তাতে কিন্তু গাড়ি বেলাইন হওয়া থেকে আটকানো যাচ্ছে না। সিরিজে খুব ভালো অভিনেতারা স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী অভিনয় করেছেন। তাঁদের যেমনটা করতে বলা হয়েছে তাঁরা তেমনই করবেন। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইমপ্রোভাইজেশনের নামে গোটা গল্পই যদি এধার থেকে ওধার হয় তবে ভালো অভিনেতারাও আর কী করবেন! 

ভাসন বালা পরিচালিত স্পটলাইট গল্পটির কথাই ধরা যাক। গোটা গল্পের আঙ্গিকটাই পাল্টে ফেলেছেন পরিচালক। সত্যজিতের গল্পে নায়কের ভূমিকা নেই বললেই চলে। অথচ এখানে পুরো ঘটনাই দেখানো হয়েছে সেই নায়কের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যাঁর কাছ থেকে আলোকবৃত্ত কেড়ে নিচ্ছেন এক তথাকথিত গুরু মা। অভিনয়ের দিক থেকে হর্ষবর্ধন কাপুর এবং রাধিকা মদন চলনসই। কিন্তু গল্পটাই যে আলাদা হয়ে গিয়েছে।

সৃজিত পরিচালিত ফরগেট মি নট-এ মূল গল্পের নিছক মধুর প্রতিশোধের ফ্লেভার অনুপস্থিত। তার বদলে যথেষ্ট ডার্ক এলিমেন্ট ঢোকানো হয়েছে। যার কোনও কারণ থাকতে পারে বলে মনে হয় না। গল্পগুলি মূলত কিশোরদের কথা মাথায় রেখেই লিখেছিলেন সত্যজিৎ। ছোটদের গল্প বা ছবি সব বয়সের মানুষকে আকর্ষণ করে। সেটা একটি বিশেষ ধরনের আর্ট। একই ভাবে সৃজিতের দ্বিতীয় গল্প বহুরুপিয়া-য় ভিঞ্চি দা-র ছায়া স্পষ্ট। এখানেও সেক্স জিনিস এমন বহুল আমদানি কেন করলেন তা বোঝা গেল না। হতে পারে লার্জার অডিয়েন্সকে আকর্ষণ করার জন্য জরুরি ছিল। তবে প্রশ্ন ওঠে, সত্যজিতের গল্প কি সেই অডিয়েন্সকে আকর্ষণ করতে সমর্থ নয়?

Advertisement

তবে এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করতেই হবে। ফরগেট মি নট গল্পে ঈপ্সিতের ফ্ল্যাটের নম্বর অনুযায়ী যে সমস্ত মালিকের নাম লেখা ছিল, তা কিন্তু অসাধারণ। কে নেই সেখানে। বীরেন কারান্ডিকার থেকে মগনলাল মেঘরাজ, মনোমোহন মিত্র, তারিণীচরণ বাঁড়ুজ্জে, অরিন্দম মুখার্জি, ভিক্টর পেরুমল, মোল্লা নাসিরউদ্দিন, রাজেশ রায়না, অর্জুন মেহরোত্রা, হাল্লা কিশোর রায়... এই তালিকার জন্য অন্তত সৃজিতের তারিফ করতেই হয়। এই ফ্রেমে সত্যজিৎকে প্রকৃত অর্থে ট্রিবিউট দিয়েছেন তিনি। তারই কিছু অংশ গল্পে থাকতে বেশি ভালো লাগত।

যে গল্প পড়ে জেনারেশনের পর জেনারেশন বড় হয়েছে, সেখানে ইমপ্রোভাইজেশন এবং সিনেম্যাটিক স্বাধীনতার নামে এই খোদার উপর খোদকারিটা করলেও চলত। যাঁরা এ গল্প পড়েননি, তাঁদের কথা আলাদা। কারণ তাঁরা ধরতেই পারবেন না মূল গল্পের সঙ্গে এর পার্থক্য কোথায়। সে দিক থেকে দেখলে এটা দর্শকদের সঙ্গেও খানিকটা বেইমানি করা হল।

শেষ পাতের খাবারই মনে রয়ে যায়। সে কারণেই সবার শেষে অভিষেক চৌবে পরিচালিত হাঙ্গামা হ্যায় কিউঁ বরপা-র উত্থাপন। গল্পে মনোজ বাজপায়ী এবং গজরাজ রাও যত ক্ষণ স্ক্রিনে ছিলেন তত ক্ষণ মনে হয়েছে সত্যিই সত্যজিতের গল্পের হিন্দি রূপান্তর দেখছি। যাঁরা ফেন্সিং দেখেছেন, তাঁরা বুঝতে পারবেন যে, ডুয়েলের সময় দুই ভালো খেলোয়াড় খেললে কেমন অনুভূতি হয়। এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায় দেখ। দুজনেই অনবদ্য। আর মোচড়ের কথাটা এখানে ফাঁস করে দিলে সম্ভাব্য দর্শকদের সঙ্গে অন্যায় করা হবে। তাই সেটি তোলা থাক। তবে নিঃসন্দেহে এটা বলা যায়, চারটি গল্পের মধ্যে এটি সেরা।

সব শেষে একটাই কথা বলার, খোদার উপর খোদকারি একজনই করতে পারেন, তিনি স্বয়ং খোদা। আর সেই খোদা সত্যজিৎ ছাড়া আর কেউ নন।

 

Advertisement