চিরঞ্জিত চক্রবর্তীছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগেই রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিলেন বারাসাতের বিধায়ক তথা অভিনেতা চিরঞ্জিত চক্রবর্তী। টানা তিনবারের জয়ী বিধায়ক স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন যে তাঁর বয়স হয়েছে, কর্মক্ষমতাও কমেছে। তাই আর তিনি ভোটে দাঁড়াতে চান না। যদিও মুখ্যমন্ত্রী অনুরোধ করলে তা ভাববার বিষয়। কেননা মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধ ফেরানো কঠিন বলেই আজতক বাংলাকে সরাসরি জানিয়েছেন অভিনেতা বিধায়ক চিরঞ্জিত চক্রবর্তী। বিধায়ক-অভিনেতৈ বলেন যে তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে নিজের বক্তব্য রাখবেন, তারপর মুখ্যমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই হবে। চিরঞ্জিত সরাসরি জানিয়ে দেন যে তাঁর রাজনীতিতে এসে জনপ্রিয় হওয়ার ইচ্ছা নেই। তাঁর কাছে প্রথম অগ্রাধিকার সিনেমা।
২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের সময় বারাসত থেকে তৃণমূলের টিকিটে প্রথমবার জয়ী হন চিরঞ্জিত। এরপর ২০১৬ এবং ২০২১ সালেও আসে জয়। কিন্তু ছাব্বিশে আর প্রার্থী হতে চাইছেন না। প্রসঙ্গত, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, রাজ্য-রাজনীতিতে একের পর এক নতুন নতুন বিষয় সামনে আসছে। কে কে প্রার্থী হবেন, তা নিয়ে জল্পনা তো রয়েছেই। আর সেই আবহে রাজনীতি ছাড়ার ইঙ্গিত দিলেন বারাসতের বিধায়ক তথা অভিনেতা চিরঞ্জিত। চিরঞ্জিতের এই বক্তব্য নিছক ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ রণকৌশল, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বের ধরন এবং রাজনীতিতে সেলিব্রিটি প্রার্থীদের ভূমিকা—এই সবকিছু মিলিয়ে একটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্নচিহ্ন।
নিজের সিদ্ধান্তের পেছনে যে কারণটি চিরঞ্জিত বারবার সামনে আনছেন, তা হল বয়স ও কর্মক্ষমতা। তাঁর কথায়, মানুষের জন্য কাজ করতে গেলে যে শারীরিক ও মানসিক উদ্যম প্রয়োজন, বয়সের ভারে তা কমে আসছে। রাজনীতিকে তিনি কখনওই হালকা ভাবে নেননি—বরং দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন। আর সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে না পারলে সরে দাঁড়ানোই শ্রেয়, এমনটাই বিধায়কের মত। এই বক্তব্যের মধ্যে একদিকে যেমন রয়েছে আত্মসমালোচনা, তেমনই রয়েছে এক ধরনের রাজনৈতিক সততা। বর্তমান সময়ে যখন অনেক রাজনীতিবিদ শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করেন, সেখানে চিরঞ্জিতের এই অবস্থান ব্যতিক্রমী বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
তবে চিরঞ্জিত নিজেই স্বীকার করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী অনুরোধ করলে বিষয়টি নতুন করে ভাবতে পারেন। কারণ, মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধ ফেরানো তাঁর পক্ষে কঠিন। এই একটি বাক্যই তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি বড় দিক সামনে এনে দেয়। ২০১১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত চিরঞ্জিতের রাজনৈতিক যাত্রাপথে একটি বিষয় বারবার ফিরে এসেছে—তিনি নিজে ভোটে দাঁড়াতে চাননি, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধে শেষ পর্যন্ত প্রার্থী হয়েছেন। ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১—তিনবারই একই ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ, চিরঞ্জিতের রাজনীতিতে আসা বা থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে সবসময়েই ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১১ সাল ছিল বাংলার রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তিন দশকের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। সেই পরিবর্তনের সময়েই বারাসত থেকে তৃণমূলের টিকিটে প্রথমবার ভোটে দাঁড়ান চিরঞ্জিত চক্রবর্তী। নিজে না চাইলেও দলের প্রয়োজনে তিনি প্রার্থী হন—এমনটাই তাঁর দাবি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেই সময় তৃণমূল কংগ্রেসের কৌশলের একটি বড় অংশ ছিল সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে পরিচিত মুখদের সামনে আনা। অভিনেতা, ক্রীড়াবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব—এঁদের মাধ্যমে পরিবর্তনের বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল লক্ষ্য। চিরঞ্জিত ছিলেন সেই কৌশলের অন্যতম সফল উদাহরণ।
রিপোর্টার- তপন কুমার নস্কর