ভুবন বাদ্যকার "বাদাম বাদাম দাদা কাঁচা বাদাম, আমার কাছে নাই গো বুবু ভাজা বাদাম...." এই গান বা গানের স্রষ্টা ভুবন বাদ্যকরকে চেনেন না এরকম মানুষ বর্তমানে বোধ হয় খুঁজে পাওয়া মুশকিল। পশ্চিমবাংলা তো বটেই, এমনকী দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও তাঁর খ্যাতি। দীর্ঘদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিংয়ে ১ নম্বরে ছিল তাঁর তৈরি 'কাঁচা বাদাম' গানটি। বছর পাঁচেক আগে 'কাঁচা বাদাম' জ্বরে কাবু ছিল নেটপাড়া। গত বছর 'কাঁচা বাদাম'-র নতুন ভার্সনও এনেছেন ভুবন, যা ফের ভাইরাল হয়।
বীরভূমের 'বাদামকাকু'-র গানে বুঁদ ছিল টলি থেকে বলিপাড়াও। এমনকী এই গান ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের বাইরেও। ট্রেন্ড থেকে বাদ যাননি বাংলার জনপ্রিয় টেলি তারকারাও। 'সুপার ভাইরাল গান 'কাঁচা বাদাম'-র ইনস্টা রিলস তৈরি হয়েছিল। যার বেশিরভাগটাই ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ছিল নেট দুনিয়ায়।
ইন্টারনেট এখন এমন একটি মঞ্চে পরিণত হয়েছে, যেখানে কেউ যদি 'ভাইরাল' হন, তাহলে তাঁর জীবনে আমূল বদল হতে পারে। মাত্র কয়েক বছর আগের কথা, পশ্চিমবঙ্গের এক অতি সাধারণ কাঁচা বাদাম বিক্রেতা, ভুবন বাদ্যকর, হঠাৎ করেই সোশ্যাল মিডিয়ার এক বিশাল তারকা হয়ে ওঠেন। এক ব্যক্তি, তাঁর গান গেয়ে বাদাম বিক্রি করার মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করে নেট মাধ্যমে আপলোড করেছিলেন, আর তাতেই তিনি রাতারাতি এক 'সেনসেশন' বা জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
ভুবন বাদ্যকর যেন এক রাতেই তারকা হয়ে যান। বড় বড় 'রিলস' নির্মাতারা তাঁর গানের রিলস তৈরি করতে শুরু করেন, যা তাঁর জনপ্রিয়তাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। ভুবন বিভিন্ন মিউজিক ভিডিওতে কাজ করার সুযোগ পান, যার সুবাদে তাঁর বেশ ভালই আয় হতে শুরু করে। যদিও তাঁর সেই গানের স্বত্ব না পাওয়া নিয়ে জল বহুদূর গড়ায়। এখন তাঁকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁর এই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যাওয়াটা অনেককেই ভাবায়।
এখন কেমন জীবন কাটাচ্ছেন ভুবন?
সম্প্রতি বিবিসি (BBC) ভুবন বাদ্যকরের গ্রামে গিয়েছিল, যা বীরভূম জেলার অদূরেই অবস্থিত। ভুবন, যিনি একসময় মাটির কুঁড়েঘরে বাস করতেন, এখন একটি পাকা বাড়ির মালিক। তিনি শুধুমাত্র নিজেরই উন্নতি ঘটাননি, বরং তাঁর নিজের সম্প্রদায়েরও উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। ভুবনের বাড়িতে আগে কোনও রান্নার গ্যাস ছিল না। এখন সেখানে গ্যাস তৈরি করা হয়েছে। গত পাঁচ বছরে তাঁর জীবন এতটাই বদলে গেছে, যে সবজি আগে তাঁদের রান্নাঘরে কালেভদ্রে জুটত, এখন তা প্রতিদিন আসে এবং তাঁর পরিবারের সবাই এখন পেটভরে খেতে পায়।
ভুবনের সন্তানেরাও তাদের এই নতুন জীবনে বেশ খুশি। তাঁর ছেলে জানায় যে, পাঁচ বছর আগে তাদের অবস্থা যেমন ছিল, এখন তারা তার চেয়ে অনেক বেশি ভাল আছে। ভুবন এখন বাড়ি ফেরার সময় তাদের জন্য সুস্বাদু খাবার নিয়ে আসেন। তবে ভুবন এখন আর কাঁচা বাদাম বিক্রি করেন না। নিজের জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি এখন বাঁশের ঝুড়ি ও হাতপাখা তৈরি করে বিক্রি করেন।
কয়েক মাস আগে ইউটিউবার নিশু তিওয়ারি ভুবনের বাড়িতে গিয়েছিলে। সেখানে এই গায়ক তাঁর জীবনের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। ভুবন জানান যে, তাঁর সেই ভাইরাল গানের জন্য তিনি কোনও 'রয়্যালটি' বা পারিশ্রমিক পাচ্ছেন না। সঙ্গীত জগতেরই কিছু অসাধু ব্যক্তি তাঁকে বড় বড় স্বপ্ন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলেছিল বলে অভিযোগ তোলেন। তারা কৌশলে তাঁকে দিয়ে তাঁর জনপ্রিয় গানটি রেকর্ড করিয়ে নেয় এবং এরপর একটি চুক্তিতে সই করিয়ে নেয়—যার ফলে তিনি তাঁর গাওয়া 'কাঁচা বাদাম' গানটির কপিরাইট বা স্বত্ব হারিয়ে ফেলেন।