ফাইল ছবিআমি রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ নই, আমি সঙ্গীতের লোক। যেভাবে ভোটটা হল, হঠাৎ সামরিক বাহিনী ঢুকল। ভাবতে পারিনি যে, ট্যাঙ্ক ঢুকবে, সাঁজোয়া গাড়ি। এটা দুঃস্বপ্নেও কেউ ভাবিনি। আমার ধারণা কেউই ভাবতে পারেনি। এইসব দিয়ে ভোট হল। এই ভোট নিয়ে মন্তব্য কীভাবে করব? এটা কী ভোট হল? এখন একটা কথা চালু হয়েছে, জনাদেশ। তাহলে এটা জনাদেশ হল। তবে জনাদেশ কেন মমতার বিপক্ষে গেল, সেটা বলতে পারব না। কারণ আমি ভোটের রাজনীতি খুব একটা বুঝি না।
আমাদের বাংলার সমাজে হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধরা আছেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত উপন্যাসটা যদি ধরি, সেখানে একটা লাইন রয়েছে, আমি হুবহু কোট করতে পারছি না। লেখা রয়েছে আজ বিকেলে বাঙালিদের সঙ্গে মুসলমাদের ফুটবল ম্যাচ। তিনি ধরেই নিচ্ছেন মুসলমানরা বাঙালি নন। শরৎচন্দ্র যদি এরকম ভাবেন, তাহলে অন্যরা কী ভাবছেন। হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে অনেকেই মুসলমানকে মোল্লা, মোলসা, কাটুয়া বলেন। আমাদের সুন্নত নিয়ে কথা বলেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে সমালোচনা অবশ্যই করা যায়, কিন্তু তাঁকে চটিপিসি বলে আমরা অভিহিত করেছি। তাঁর পক্ষে যারা যায়, তাঁদের চটিচাটা বলা হয়। রাজনীতি রাজনীতির ভাষায় লড়ব। চটিচাটা, চটিপিসি, কালীঘাটের ময়না, এগুলো কী! এই দীর্ঘসময় ধরে যে আমরা অপসংস্কৃতির চর্চা করে গেলাম, এর জল বহুদূর যাবে। আমার যারা সন্তানপ্রতিম তাঁরা তো থাকবেন, তাঁরা কেমন দেশ দেখবেন? যেখানে একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসে দিদি দিদি... করে যান। অদ্ভুত! আমরা এতটা পাল্টে গেলাম। এই দেশেই একদিন ইন্দিরা গান্ধী জরুরী অবস্থা জারি করেছিলেন, কিন্তু সেই জনগণই তাঁকে ফেরত আনলেন। এটা হচ্ছে ভারত।
আমার নিজের অনুভব, আমি তো তৃণমূলের মেম্বার নই, আমি তৃণমূলপন্থীও নই। আমায় মমতা প্রায় হাতেপায়ে ধরে দাঁড় করিয়েছিলেন। তাঁর আগে আমি কোনও পার্টির মেম্বার ছিলাম না। আমার ৫ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্র আমি পদত্যাগ করি।
আমি মনে করি, একাধিক ভুল হয়েছে, মানুষ সেটা ভালো চোখে নেয়নি। যেমন চাকরি। চাকরির ক্ষেত্রটা ভয়ঙ্করভাবে মার খেয়েছে। মানুষ সেটা ভালো চোখে নেননি। মমতা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কী সব ঠিক কাজ করেছেন? উত্তর না, তিনি পারেননি। আমি এবার তৃণমূলকে ভোট দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু আমি তৃণমূলের কাজে খুশি হতে পারিনি। দলের বহু কথা ও অ্যাটিটিউডে মানুষ ধাক্কা খেয়েছে। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক ভালো কাজও করেছেন। যেমন সবুজসাথী। বাচ্চারা সাইকেল পেয়েছে। এটা কতবড় কাজ। এসব কাজের পর হয়ত একদিন মমতার একটা মন্দির হবে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজ বা রাজনীতি নিয়ে কোনওকিছুই খবর রাখি না। আমি ফেসবুকে মন্তব্য করি, কারণ আমি চাই তৃণমূল জিতুক। সিপিএম বা তৃণমূল আমলে মেয়েদের নিরাপত্তা কিন্তু সুনিশ্চিত ছিল। আমি আশা করব, নতুন সরকার যেন সেই ট্রাডিশন বজায় রাখবেন।
আমার মনে হয় আমার একক অনুষ্ঠান আর হবে না। রবীন্দ্রজয়ন্তীতে একটা অনুষ্ঠান আছে। কিন্তু আমার নিজের গানের অনুষ্ঠান মনে হয় আর হবে না। বিজেপি সরকার গঠন করছেন, আমি তাঁদের অভিনন্দন জানাচ্ছি। তাঁরা দরিদ্রের, পরিবেশের, পশু-পাখির পাশে থাকুন। সবুজের পাশে থাকুন, জলের পাশে থাকুন। এটুকুই বলতে চাই। আমি শুধু গান গাই না, আমার সঙ্গে চারজন বাজান, অনুষ্ঠান পেলে তাঁদের কিছু রোজগার হয়। এখনও ভোট হলে আমি তৃণমূলকেই দেব। তবে সেরকম কোনও কমিউনিস্ট পার্টি এলে আমি এই বুড়ো বয়সেও তাঁদের সদস্য হতে চেষ্টা করব। আমি তাঁদের জন্য গান বাঁধব, আমি তাঁদের পাশে থাকব।
(সুকমল শীলের নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত)