scorecardresearch
 

সফদর হাশমি: গুন্ডাদের হামলায় পথেই মৃত্যু নেমে আসে পথ নাটকের অন্যতম পথিকৃতের

তাঁর লেখা নাটক 'হাল্লা বোল' আজ ছাত্রযুবদের আন্দোলনের অন্যতম ট্যাগলাইন হয়ে উঠেছে। আজকের দিনেই ১৯৫৪ সালে জন্ম সফদর হাশমির। তরুণ বয়স থেকেই বাম ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সফদর তাঁর প্রতিভার পুরোটাই ঢেলে দিয়েছিলেন সাধারণ খেটে খাওয়ার মানুষের জন্য।

সফদর হাশমি। ছবি সৌজন্য সোশাল মিডিয়া। সফদর হাশমি। ছবি সৌজন্য সোশাল মিডিয়া।
হাইলাইটস
  • পথ হারাবেন বলে পথে নামেননি সফদর হাশমি। বরং পথের দিশা দেখাতেই নেমেছিলেন
  • কিন্তু সেই পথেই অমোঘ মৃত্যু এসে দেখা গিল তাঁর জীবনে। মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই
  • তাঁর লেখা নাটক 'হাল্লা বোল' আজ ছাত্রযুবদের আন্দোলনের অন্যতম ট্যাগলাইন হয়ে উঠেছে

'এই পথেই জীবন, এই পথেই মরণ আমাদের, সব কিছু পথের বুকেই...'

পথ হারাবেন বলে পথে নামেননি সফদর হাশমি। বরং পথের দিশা দেখাতেই নেমেছিলেন। কিন্তু সেই পথেই অমোঘ মৃত্যু এসে দেখা গিল তাঁর জীবনে। মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই। তাঁর লেখা নাটক 'হাল্লা বোল' আজ ছাত্রযুবদের আন্দোলনের অন্যতম ট্যাগলাইন হয়ে উঠেছে। আজকের দিনেই ১৯৫৪ সালে জন্ম সফদর হাশমির। তরুণ বয়স থেকেই বাম ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সফদর তাঁর প্রতিভার পুরোটাই ঢেলে দিয়েছিলেন সাধারণ খেটে খাওয়ার মানুষের জন্য। কোনও হলে নয়, তিনি থিয়েটারকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন মানুষের মাঝে।

 

এমন ভাবেও যে একটি আন্দোলন, একটি শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় তা এর আগেই দেখিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক, উৎপল দত্ত, বিজন ভট্টাচার্যের মতো গুণী মানুষ। সেই একই রাস্তায় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হেঁটেছেন সফদর হাশমি। সেন্ট স্টিফেনস কলেজ, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের কৃতী ছাত্র ছিলেন তিনি। সহজেই কোনও ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে পারতেন। তাতে অর্থের অভাব হত না। আর এই মানসিকতার বিরুদ্ধেই বারবার কথা বলেছেন তিনি। তাঁর শিক্ষা, তাঁর সমাজচেতনা, রাজনীতি তাঁকে নিয়ে আসে মানুষের মাঝে। ভারতীয় গণনাট্য সংঘে জড়িয়ে পড়াও ছাত্র বয়স থেকেই। মঞ্চে নাটক দেখানোর সামর্থ্য ছিল না সফদরের। চার দেওয়ালে ঘেরা হলে কতজন আসবেন, কতজন তাঁদের কথা শুনবেন তা নিয়েও সন্দিহান ছিলেন তিনি। তাই বেরিয়ে এলেন পথে, কিন্তু ফেরা হল না।

সত্তরের দশকে ভারত যেমন দেখেছে নকশাল আন্দোলন, তেমনই দেখেছে জরুরি অবস্থা। এই সময়েই জন্ম হয় ‘জনম’-এর। সফদর হাশমির এই নাট্যদলটি নিজেদের নাটক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়, গলিতে, রাজপথে। তৈরি হল ‘জননাট্য মঞ্চ’। জন্ম লগ্ন থেকেই ভারতীয় শিল্পজগত ও জনতার নজর কেড়ে নিল জনম। ‘কুর্সি, কুর্সি, কুর্সি’ পথনাটিকটি প্রায় প্রতিদিনই অভিনীত হতে থাকল রাজধানীর আশপাশের ভিভিন্ন স্থানে। এবং এই নাটকটিই মোড় ঘুরিয়ে দিল সফদর হাশমির। বলা ভালো, আওয়াজ তৈরি হওয়া শুরু হয়েছিল এখান থেকেই।

 

তাঁর সৃষ্টির আওয়াজ এত তীক্ষ্ণ ছিল যে, তা পৌঁছে গিয়েছিল ক্ষমতার অলিন্দে বসা কেন্দ্রীয় সরকারের বড় বড় নেতা-মন্ত্রী-আমলাদের কানে। ১৯৮৯ সালে ১ জানুয়ারি নতুন লেখা নাটক হাল্লা বোল নিজের দলের সঙ্গে পারফর্ম করছিলেন সফদর। দিল্লিরই অদূরে শাহিবাবাগে। হঠাৎই পুলিশের নেতৃত্বে সেই নাটকের দলের ওপর চড়াও হয় একদল লোক। লাঠি-রড দিয়ে এলোপাথারি মারধর শুরু হয়। টার্গেট যে সফদর স্বয়ং ছিলেন তা হামলার ধরন দেখে বুঝতে বাকি থাকেনি বাকিদের। কালো মোটা ফ্রেমেডের চশমা আর বলিষ্ঠ উপস্থিতি তখন রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটোচ্ছে। তাঁকে তৎক্ষণাৎ হালপাতালে নিয়ে গিয়েও লাভ হয়নি। মাথার গুরুতর আঘাতে পরদিন ২ জানুয়ারি মারা যান সফদর। তাঁর সঙ্গে এই হামলায় প্রাণ হারান আরও এক পরিযায়ী শ্রমিক রাম বাহাদুর।

 

ঘটনার প্রতিবাদে ঠিক ২ দিন পর ৪ জানুয়ারি হামলার জায়গায় হাল্লা বোল নাটক মঞ্চস্থ করেন সফদরের স্ত্রী মলয়শ্রী হাশমি। এটাই তাঁর ও সফদরের নাটকের দল জনমের শ্রদ্ধার্ঘ্য ছিল এই শিল্পীর প্রতি। সফদরের হত্যার অপরাধে গাজিয়াবাদ আদালত ১০ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে। যার মধ্যে ছিলেন দিল্লির ভোটে কংগ্রেসের মেয়র পদপ্রার্থী মুকেশ শর্মাও। সফদররা বার বার আক্রান্ত হয়েছেন। ক্ষমতাসীনদের নির্লজ্জতার খতিয়ান বার বার তুলে ধরার জন্য এঁদের মতো মানুষদের বার বার রক্তাক্ত হতে হয়েছে। ক্রুর আঘাতে মৃত্যু বরণ করতে হয়েছে। কিন্তু প্রতিবাদ থেকে থাকেনি। প্রতিবাদ থেমে থাকেন না।