
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্য়ায়গত রবিবার রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ সকলে। শোকের ছায়া বাংলা বিনোদন জগতে। এই মৃত্যু ঘিরে রয়েছে নানা ধোঁয়াশা। উঠে আসছে নানা রকম তত্ত্ব। ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই তুলছেন নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন। এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করছেন অনেকেই।
রাহুলের দেহের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট সামনে আসে সোমবার দুপুরে। সেই অনুযায়ী, শরীরে অতিরিক্ত বালি ও নোনা জল ঢুকে যাওয়ার কারণে মৃত্যু হয়েছে অভিনেতার। এই ঘটনার তিন দিন পরে, আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করেছে 'ভোলে বাবা পার করে গা' ধারাবাহিকের প্রযোজনা সংস্থা ম্যাজিক মোমেন্টস মোশন পিকচার্স। এদিনই বিবৃতি দেওয়া হয় আর্টিস্ট ফোরামের তরফেও।
উত্তর অধরা
কেন- কীভাবে আউটডোর শ্যুটিংয়ে গিয়ে একজন শিল্পীর জলে ডুবে মৃত্যু হবে? বিপদে পড়া কোনও শিল্পীকে বাঁচানোর কোনও ব্যবস্থা প্রযোজকদের তরফে আগে থেকে কেন করা হয়নি? এই বিপজ্জনক জায়গাতে শ্যুটিং করা হল কেন? কেন ওই ধারাবাহিকের কলাকুশলী, অভিনেতাদের কথায় এত অমিল- রাখঢাক? ইত্যাদি নানা প্রশ্ন উঠছে।
জাস্টিস ফর রাহুল
সোশ্যাল মিডিয়ায় 'জাস্টিস ফর রাহুল' স্লোগান তুলেছে টলিপাড়া। এবার খবর, সিনেপাড়ার অনেক তারকারা একটি মিছিলে যোগ হাঁটবেন। শনিবার, বিকেল ৪টের সময় টেকনিশিয়ান স্টুডিও থেকে 'জাস্টিস ফর রাহুল' এই মিছিল শুরু হবে। যেখানে থাকতে পারেন টলিউড থেকে বাংলা টেলিভিশন জগতের শিল্পীরা।

আর্টিস্ট ফোরামের বিবৃতি
আর্টিস্ট ফোরামের বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, "গত কয়েক দিন ধরে এই মৃত্যুকে ঘিরে যে সমস্ত ঘটনা প্রকাশ্যে আসছে এবং প্রযোজক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন বিতর্কিত মন্তব্য করছেন তাতে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছে সবাই। এত রকম বিতর্কিত মন্তব্যের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে আসল প্রশ্নগুলি, কেন রাহুল কে এই দুর্ঘটনায় পড়তে হল? তাহলে কি বিপদে পড়া কোনও শিল্পীকে বা কলাকুশলীকে বাঁচানোর কোনও ব্যবস্থা প্রযোজকদের তরফ থেকে আগে থেকে করা হয়নি? এই বিপজ্জনক জায়গাতে শ্যুটিং করা হল বা কেন? এরকম আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তার পরিবার, তার বন্ধুরা, তার অনুগামী দর্শকরা এবং আমরা তার সহকর্মীরা। আমরা এই দুর্ঘটনার বিষয়ে একটি স্বচ্ছ উত্তর চেয়ে ওই প্রযোজনা সংস্থাকে চিঠি দিয়েছি। আশা করি তারা আমাদের যথাযথ উত্তর দেবেন। যদি তারা উত্তর না দেন, তাহলে যথাযথ পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

প্রযোজনা সংস্থার বিবৃতি
'ভোলেবাবা পার কারেগা' ধারাবাহিকের প্রযোজনা সংস্থা ম্যাজিক মোমেন্টস মোশন পিকচার্সের তরফে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়, "আমরা, ম্যাজিক মোমেন্টস মোশন পিকচার্স-র পক্ষ থেকে, আমাদের সহকর্মী রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অকাল প্রয়াণে গভীরভাবে শোকাহত। আমাদের টিমের সকল শিল্পী এবং সদস্য বর্তমানে গভীর শোকে বিহ্বল। ই বিবৃতির মাধ্যমে আমরা তাঁদের এ-ও জানাতে চাই যে- যদি তাঁদের মনে কোনও সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থেকে থাকে, তাহলে আমাদের সাধ্যমতো তার উত্তর দিতে আমরা প্রস্তুত। আমরা এই বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ যে,অবহেলার বিন্দুমাত্র কোনও সম্ভাবনাও যেন আমাদের অনুসন্ধানের বাইরে থেকে না যায়—তা আমরা নিশ্চিত করব। ফেডারেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে পূর্ব-জানানো বা অনুমতির বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নানাবিধ জল্পনার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা জানাতে চাই যে—আমাদের যাবতীয় যোগাযোগ, প্রাপ্ত অনুমতিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট নথি সবই আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং মনোনীত প্রতিনিধির কাছে পেশ করব, যদি তাঁরা তা দেখতে ইচ্ছুক হন। তদন্তকাজে প্রয়োজনীয় সমস্ত নথি ও তথ্য-প্রমাণ সরবরাহ করার মাধ্যমে পূর্ণ সহযোগিতা করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
প্রযোজনা সংস্থার তরফে আরও জানানো হয়, "রাহুলকে যখন জল থেকে উদ্ধার করা হয়, তখন তিনি জীবিত ছিলেন এবং কথা বলার চেষ্টা করছিলেন—যদিও সম্ভবত তিনি স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারছিলেন না। তাঁকে অবিলম্বে জল থেকে পাড়ে তুলে আনা হয় এবং তাঁর শরীর থেকে জল বের করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা চালানো হয়। এরপর তাঁকে নিকটস্থ একটি নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হয়। দুর্ভাগ্যবশত, সেই সময়ে ওই চিকিৎসাকেন্দ্রে কোনও চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। ফলে, তাঁকে পুনরায় সেখান থেকে দিঘা হাসপাতালে স্থানান্তরিত করতে হয়; সেখানেই শেষমেশ তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। আমরা এই ভেবে গভীরভাবে মর্মাহত যে, প্রথম নার্সিংহোমটিতে যদি কোনও চিকিৎসক বা উপযুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকত, তবে হয়তো তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকত।"
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, "আমরা আরও একটি বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই। সম্প্রতি ম্যাজিক মোমেন্টস মোশন পিকচার্স-কে প্রায়শই শুধুমাত্র ‘লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের কোম্পানি’ হিসাবে উল্লেখ করা হচ্ছে। আমরা বিষয়টি স্পষ্ট করে দিতে চাই যে, লীনা ২০১০ সাল থেকে এই কোম্পানির সঙ্গে একজন লেখক এবং 'ক্রিয়েটিভ হেড'(সৃজনশীল প্রধান) হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। তিনি ২০১১ সালে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে যোগ দেন। তবে, তিনি কোম্পানির কোনও 'প্রমোটার' বা পরিচালনা সংক্রান্ত নির্বাহী কর্মকর্তা নন। তাঁর ভূমিকা সব সময়ই শুধুমাত্র সৃজনশীল দায়িত্ব পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল—যা এই শিল্পের সকলের কাছেই সুপরিচিত। অতি সম্প্রতি আমাদের অনুষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে তাঁকে সব সময় শুধুমাত্র 'লেখক' হিসেবেই কৃতিত্ব দেওয়া হত। এরপর তাঁকে কোম্পানির অতি সামান্য পরিমাণ শেয়ার এবং 'সহ-প্রযোজক'-এর কৃতিত্ব প্রদান করা হয়। কোম্পানির সাংগঠনিক কাঠামো বা শেয়ার-বিন্যাস পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমরা বুঝতে পারছি যে, পশ্চিমবঙ্গ মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন হিসাবে লীনার ভূমিকার কারণেই হয়তো এই ধরনের ধারণা বা অনুমান তৈরি হতে পারে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে, লীনা তাঁর চেয়ারপার্সন পদ থেকে সরে দাঁড়াতে ইচ্ছুক—যাতে রাহুলের মৃত্যুর তদন্ত প্রক্রিয়ায় কোনও প্রকার পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ বা ধারণার প্রভাব না পড়ে এবং একই সঙ্গে এই সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর দায়িত্ব পালনেও যেন কোনও ব্যাঘাত না ঘটে।"
প্রসঙ্গত, টলিপাড়ার পরিচিত মুখ রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। রবিবার দিঘার তালসারিতে 'ভোলে বাবা পার করেগা' ধারাবাহিকের শ্যুটিং করতে গিয়ে জলে ডুবে মৃত্যু হয় অভিনেতার। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মৃত্যু নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠে আসে। রবিবার পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে রাহুলের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। ছোটপর্দা, বড়পর্দা, মঞ্চ থেকে ওটিটি, সব মাধ্যমেই নিজের অভিনয় দক্ষতায় সকলের মন বারবার জয় করেছেন। সম্প্রতি নিজের পডকাস্ট চ্যানেলের মাধ্যমের সকলের মনের আরও কাছে পৌঁছান অভিনেতা।
তাম্রলিপ্ত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়াত অভিনেতার ময়নাতদন্ত হওয়ার পরই দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। রবিবার, রাহুলের স্ত্রী তথা অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার অভিনেতার বিজয়গড়ের বাড়িতে যান রাতেই। এই সময় তাঁকে ও রাহুল-পুত্র সহজকে এখন একা ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন সকলকে। সোমবার তাম্রলিপ্ত হাসপাতাল সূত্রের খবর, যে পরিমাণ বালি ফুসফুসে পাওয়া গিয়েছে তা অস্বাভাবিক। কম সময় জলে ডুবে থাকলে এত বালি পাওয়া যেত না। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, অন্তত এক ঘণ্টা জলের তলায় ডুবে ছিলেন রাহুল। জলের তলায় হয়তো সেই অবস্থাতেই পড়েছিলেন। সেই কারণে হয়তো তাঁর দেহ থেকে এতটা বালি ও নোনা জল মিলেছে।