বেচু ঘোষ লেগে পড়েছেন মরদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার কাজে। ছবি: ভাস্কর রায়রাত দু'টো বাজলেই শববাহী গাড়ির সাইরেনের শব্দে ঘুম ভাঙে বেচুর। কিট পড়ে গাড়ির সামনে ছুটে যান তিনি। এক এক করে প্লাস্টিকে মোড়া মরদেহ জমে যায় বেচুর চোখের সামনে। মালদায় ৩১৭ শবদেহ দাহ করে করোনা-বীর মেমারির বেচু।
এ যেন লাশের পাহাড়! কোত্থেকে আসছে এই মৃত্যুমিছিল? না, কখনও ঘাবড়ে যাননি বেচু। তিনি তো সবই জানেন। কী রোগে মৃত্যু, কেন আসছে এখানে, তাঁর অজানা নয়। আর নেমে পড়েন কাজে।
পেটের দায়ে মানুষ সব কিছু করতে পারে। এটা বেচুও বিশ্বাস করেন। বাড়ির সন্তান-সন্ততিরাও জানে, ওদের বাবা মালদায় গিয়ে কীসের 'চাকরি' করছেন। পরিবার থেকে আপত্তি আসেনি। বর্ধমানের মেমারির ছেলে বেচু। নাম বেচু ঘোষ। বয়স এখন ৩৬।
একসময় মেমোরিতে একটা ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলে বেড়াতেন তিনি। বিয়েবাড়ি কিংবা অনুষ্ঠানের ছবি তুলতেন। কিন্তু তা দিয়ে সংসার চলত না। বাড়িতে বৃদ্ধ মা-বাবা, স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে।
অভাব, অনটন পিছু ছাড়েনি। করোনা আবহে প্রথম লকডাউনেই বদলে যায় বেচুর জীবনের রোজনামচা। বছর দু'য়েক আগে যাঁর হাতে ক্যামেরা ছিল, তাঁর হাতে এখন লাশ পোড়ানোর আগুন। পেটের দায়ে মেমারির ছেলে বেচু ঘোষ এখন মালদায় এসে লাশ পোড়ান।
এজন্য অতিরিক্ত মজুরি পান না তিনি। বেসরকারি সংস্থায় 'চাকরি' বাঁচাতে কোভিড দেহ দাহ করতে তিনি একবাক্যে রাজি হয়েছিলেন। একটি-দু'টি নয়, মালদায় এক এক করে ৩১৭টি কোভিড লাশ পুড়িয়ে বেচু এখন 'কোভিড-যোদ্ধা'।
কোভিডে মৃত দেহ দাহ করতে গিয়ে শুরুতেই ওল্ড মালদায় বাধা পেয়েছিল মালদহ জেলা প্রশাসন। ওল্ড মালদায় জনরোষের জেরে দেহ দাহ করা সম্ভব হয়নি।
এই সময় শ্মশানে বৈদ্যুতিক চুল্লি সরবরাহকারী একটি বেসরকারি সংস্থার এক ঠিকাদার বর্ধমানের মেমোরির বেচু ঘোষকে মালদায় গিয়ে কোভিড দেহ পোড়ানোর কাজের প্রস্তাব দেন।
বেচুর কথায়, "আমি মরা পোড়াব, সে কথা কখনও ভাবিনি। পেটের দায়ে দাঁতে দাঁত চেপে চলে আসি মালদায়।" এখন কালিয়াচকের সুলতানগঞ্জের শ্মশানে তিনি ঠিকা শ্রমিক হিসেবে কর্মরত। রয়েছে বৈদ্যুতিক চুল্লি। রোজ রাতে লাশ পোড়াচ্ছেন।
মালদহ ও দুই দিনাজপুরের ৩১৭টি দেহ পুড়িয়ে এখন 'করোনা-বীর' বেচু ঘোষ। কিন্তু একটি দেহ পুড়িয়ে এক পয়সাও পান না বেচু। ঠিকাদার সংস্থার শ্রমিক হিসাবে যা মাইনে পান সেটা দিয়েই সংসার টানেন তিনি।
বেচু বলছিলেন, "জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোভিড দেহ দাহ করছি। যে কোনও সময় সংক্রমিত হতে পারি। আমরা যোদ্ধা বা বীরের সন্মান চাই না। মরে গেলে সরকার যাতে আমার পরিবারের পাশে দাঁড়ায়, এটাই চাই।"