রূপা রেড্ডি চিত্রনাট্যকেও হার মানাবে এই গল্প। দশম শ্রেণীর ছাত্রদের হাতে খুন তেলেঙ্গানার এক স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। এক আধবার নয়, ২৭ বার ছুরি মেরে সেই রূপা রেড্ডিকে খুন করে নাবালকরা। তাও আবার শিক্ষিকার বাড়িতেই। তারপর প্রমাণ লোপাটের চেষ্টাও করে। গত ১১ অগাস্ট এই ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কার্যত দিশাহীন ছিল। কিছুতেই ঘটনার কিনারা করতে পারছিল না। অবশেষে একাধিক তথ্য-প্রমাণ হাতে পাওয়ার পর দশম শ্রেণির ২ ছাত্রকে আটক করেন তদন্তকারীরা। পুলিশ সূত্রে খবর, খুনের আগে শিক্ষিকার বাড়িতে রেকি করেছিল অভিযুক্তরা।
নালগোন্ডার পুলিশ সুপার শরৎচন্দ্র পাওয়ার জানিয়েছেন, ঘটনার কিনারায় প্রথমে পাঁচটি তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছিল। খুনিদের সন্ধানে প্রায় ৭০টি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখা হয়। তবে কয়েক দিন কার্যত কোনও ক্লু মেলেনি। তদন্তে বড়সড় মোড় আসে রূপা রেড্ডির একটি ফোনের ভিডিও ক্লিপ দেখার সময়। পুলিশ জানিয়েছে, সেই কথোপকথনের কোনও এক সময় তিনি কাউকে ‘বাবু’ বলে সম্বোধন করেছিলেন।
এই 'বাবু' শব্দই তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তদন্তকারীরা জানতে পারেন, স্কুলে পড়ুয়াদের ‘বাবু’ বলে ডাকতেন রূপা রেড্ডি। সেই সূত্র ধরে খুনের সময়ের আশপাশে কোন কোন পড়ুয়া স্কুলে অনুপস্থিত ছিল, তা খতিয়ে দেখা শুরু হয়।
১৩ পড়ুয়ার মধ্যে সন্দেহ দুই ছাত্রকে ঘিরে
সেই ফুটেজ সামনে আসার পর পুলিশ প্রথমে ১৩ জন পড়ুয়াকে চিহ্নিত করে। তাদের মধ্যে পাঁচজন ছিল দশম শ্রেণির ছাত্র। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। তদন্তকারীদের নজরে আসে, অনুপস্থিত থাকা দুই ছাত্র হঠাৎ প্রচুর টাকা খরচ করছিল। তারপরই তাদের উপর সন্দেহ বাড়ে তদন্তকারীদের। এক নাবালকের কাছ থেকে ১ লক্ষ ৫৪ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।
ওই ছাত্র দাবি করে, তার বাবা-মা তাকে ওই টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ টাকা পরীক্ষা করে দেখতে পায়, সেই নোটগুলিতে রক্তের দাগ। ফরেন্সিক তদন্তের পর জানা যায়, সেই রক্ত আসলে রূপা রেড্ডিরই। এরপরই ওই দুই নাবালক প্রধান সন্দেহভাজন হয়ে ওঠে।
কেন প্রধান শিক্ষিকার উপর ক্ষোভ?
তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, অভিযুক্তদের মধ্যে একজন আগে স্কুলের হস্টেলে থাকত। সে মদ্যপান কতর। মোটরবাইকের প্রতিও তার আসক্তি ছিল। ফলে তাকে চোখে চোখে রাখতেন রূপা রেড্ডি। একবার তো তিনি সেই ছাত্রের ব্যাগ থেকে টাকা এবং একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছিলেন। ছাত্রটির হস্টেলে থাকার অনুমতিও কেড়ে নেওয়া হচ্ছিল। প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশ জানতে পারে, এই ঘটনার জেরেই রূপা রেড্ডির উপর ওই ছাত্রের ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
খুনের পাঁচ দিন আগে বাড়িতে রেকি
পুলিশের দাবি, খুনের পাঁচ দিন আগে অভিযুক্তদের একজন রূপা রেড্ডির বাড়িতে রেকি করেছিল। সেই ছাত্রটি ভেবেছিল ফি বাবাদ ছাত্রদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা প্রধান শিক্ষিকার বাড়িতেই আছে। ফলে সেই টাকা চুরি করা যেতে পারে। এরপরই তারা পরিকল্পনা করে।
আর পাঁচদিনের মতো ১১ অগাস্ট স্কুল থেকে বাড়ি ফেরেন রূপা রেড্ডি। পুলিশের অভিযোগ, এরপর দুই নাবালক বাড়ির পাঁচিল টপকে ভিতরে ঢোকে। তাদের মুখে ছিল মাস্ক। ফলে সম্ভবত শিক্ষিকা তাদের তখন চিনতে পারেননি। কিন্তু রূপা রেড্ডিকে যখন হামলা করা হয় তখন হয়তো একজনের মাস্ক খুলে গিয়েছিল। তাকে চিনেও ফেলেন শিক্ষিকা। তারপরই তাঁকে ছুরি দিয়ে বারবার আঘাত করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মোট ২৭ বার ছুরি দিয়ে কোপানো হয়েছিল। খুনের পর অভিযুক্তরা বাড়ি থেকে নগদ টাকা এবং দুটি মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যায় বলে পুলিশের অভিযোগ।
তদন্তের পর এক অভিযুক্তের কাছ থেকে ১ লক্ষ ৫৪ হাজার টাকা, একটি আইফোন এবং রূপা রেড্ডির মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। দুই অভিযুক্তই নাবালক। ফলে তাদের জুভেনাইল জাস্টিস কোর্টে পেশ করা হবে। ঘটনার তদন্ত এখনও চলছে।