থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন শিশুটির পরিবার। কলকাতার প্রি-স্কুলে শিশু-নির্যাতনের অভিযোগ। সল্টলেকের অভিজাত প্রি-স্কুলে সাড়ে ৩ বছরের এক শিশুকে 'শাস্তি' দিতে অন্ধকার আলমারির ভিতর আটকে রাখার অভিযোগ উঠল দুই শিক্ষিকার বিরুদ্ধে। ২০ ফেব্রুয়ারির ওই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ইতিমধ্যেই থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন শিশুটির পরিবার। পাশাপাশি ঘটনার তদন্তে নেমেছে West Bengal Commission for Protection of Child Rights (ডব্লিউবিসিপিসিআর)।
পরিবার সূত্রে খবর, অভিযুক্ত দুই শিক্ষিকার নাম সায়িতা কর্মকার এবং ইন্দিরা দাস। শিশুর বাবার লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ওই দিন জোর করে শিশুটিকে একটি ফাঁকা ক্লাসরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে তাকে কোণায় বসিয়ে রাখা হয়। পরে একটি ভারী টেবিল সরিয়ে এনে আলমারির সামনে রাখা হয় এবং জোর করে শিশুটিকে আলমারির ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, বাইরে থেকে টেবিল ঠেসে দিয়ে বেরোনোর পথও কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
পুরো ঘটনাই ধরা পড়ে স্কুলের সিসিটিভি ক্যামেরায়। বারংবার অনুরোধের পর শিশুর মা সেই ফুটেজ দেখতে পান। ভিডিওতে দেখা যায়, এক শিক্ষিকা শিশুটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। অন্য এক শিক্ষিকা ঘরে ঢুকে জল খেতে খেতে গোটা ঘটনা দেখছেন। পরে তিনিও আলমারিতে পুরে রাখার ঘটনায় সহযোগিতা করেন। কয়েক সেকেন্ড পর টেবিল সরিয়ে শিশুটিকে বের হতে দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে মানসিক আঘাত গভীর হয়েছে বলেই মনে করছে পরিবার।
ঘটনার পর থেকেই শিশুটি তীব্র মানসিক আঘাতে ভুগছে বলে দাবি পরিবারের। University of Calcutta-র ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সেন্টারের পর্যবেক্ষণ রিপোর্টে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গুরুতর প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, সে চরম শক এবং ঘুমের সমস্যায় ভুগছে। এমনকি স্কুলে যেতে বা অভিযুক্ত শিক্ষিকাদের সামনেও আর যেতে চাইছে না।
শিশুটির বাবা, কর্মসূত্রে ভিনরাজ্যে থাকেন। খবর পেয়ে তড়িঘড়ি কলকাতায় ফেরেন। তাঁর কথায়, 'আমরা একেবারে ভেঙে পড়েছি। কোনও মানুষ কীভাবে এমন কাজ করতে পারে? আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব, যাতে আর কোনও শিশুর সঙ্গে এমন না হয়।'
ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে ডব্লিউবিসিপিসিআর। কমিশনের চেয়ারপার্সন তুলিকা দাস জানিয়েছেন, প্রতিটি স্কুলেরই বাধ্যতামূলক 'চাইল্ড প্রোটেকশন পলিসি' থাকা উচিত এবং তা কঠোর ভাবে মেনে চলা প্রয়োজন। কমিশন ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে। প্রয়োজনে স্কুলে বিশেষ দল পাঠানো হবে বলেও জানানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, অভিযুক্ত শিক্ষিকাদের বরখাস্ত করলেই ঘটনার গুরুত্ব কমে যায় না।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্কুল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকাদের অবিলম্বে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং লিখিত ভাবে পুলিশকে জানানো হয়েছে। তাদের বক্তব্য, কর্পোরাল পানিশমেন্টের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হয়। শিশুটির পরিবারের সঙ্গেও একাধিক বৈঠক হয়েছে বলে দাবি প্রশাসনের।
তবে পরিবার সন্তুষ্ট নয়। তাদের অভিযোগ, গোটা ঘটনায় স্কুলের নিরাপত্তা প্রোটোকলে বড়সড় গাফিলতি রয়েছে। প্রথম দিকে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও দাবি। তাই আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবার।
কলকাতার মতো শহরে প্রি-স্কুলে শিশু-নির্যাতনের অভিযোগে স্বাভাবিকভাবেই শিশুদের নিরাপত্তা ও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।