
কিংবদন্তি আছে, মহাদেবের ইচ্ছে না হলে অমরনাথ দর্শন হয় না। সবার ভাগ্যে এই পুণ্য মুহূর্ত জোটে না। প্রতিবছর কয়েকলক্ষ পুণ্যার্থী অমরনাথ দর্শনের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেন। এবারেও প্রায় ৪ লক্ষ ভক্ত অমরনাথ যাত্রার জন্য রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন। ২০২৬ সালের অমরনাথ যাত্রা আজ অর্থাত্ বৃহস্পতিবার সূচনা হল। ৫ হাজারের বেশি যাত্রী, অমরনাথ যাত্রার প্রথম ব্যাচ রওনা হল। সূচনা করলেন জম্মু-কাশ্মীরের লেফটেন্যান্ট গভর্নর মনোজ সিনহা।

কাশ্মীরের পহেলগাঁও ও বালতাল, দুই বেসক্যাম্প ভক্তরা রওনা হয়েছেন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩ হাজার ৮৮০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত পবিত্র অমরনাথ গুহা মন্দিরে ৫৭ দিনের অমরনাথ যাত্রা। প্রতিবছর একই সময়ে অমরনাথে গুহায় তৈরি হয় বরফের শিবলিঙ্গ। যুগ যুগ ধরে এ এক বিস্ময়!

প্রতিবছর একই সময়ে এই শিবলিঙ্গ কীভাবে তৈরি হয়? এর পিছনে কী বিজ্ঞান রয়েছে? অমরনাথের শিবলিঙ্গ নিয়ে IIT বম্বের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞানী ডি চন্দ্রশেখরণের একটি স্টাডি সম্প্রতি জিওলজিক্যাল সোসাইটিতে প্রকাশিত হয়েছে। সেই স্টাডিতে বলা হয়েছে, অমরনাথ গুহার বরফের শিবলিঙ্গ আসলে একটি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া বরফের স্ট্যালাগমাইট। গুহার ছাদ থেকে গলে পড়া জল অত্যন্ত ঠান্ডায় জমে ধীরে ধীরে এই বরফের স্তম্ভের সৃষ্টি হয়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ভারতের বহু প্রাচীন পুরাণকথা এবং পবিত্র তীর্থস্থানের পেছনে এমনই বিস্ময়কর ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া কাজ করে। তবে এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সেই স্থানগুলির ধর্মীয় গুরুত্ব বা মানুষের বিশ্বাসকে কোনওভাবেই খাটো করে না।

স্টাডিতে বলা হয়েছে, শ্রীনগর থেকে ১৪৫ কিমি উত্তরপূর্বে প্রায় ৪ হাজার মিটার উচ্চতায় হিমালয়ের গুহায় এই শিবলিঙ্গ তৈরি হয়। গুহার উপরে থাকা চুনাপাথর ও জিপসাম শিলার ফাটল এবং সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে বরফ ও হিমবাহের গলিত জল ধীরে ধীরে গুহার ভিতরে প্রবেশ করে। সেই জল ফোঁটা ফোঁটা করে গুহার মেঝেতে পড়ে। গুহার ভেতরের হিমাঙ্কের নীচের তাপমাত্রার কারণে জল প্রতিটি স্তরে জমে যেতে থাকে।

এভাবেই বছরের পর বছর বরফের স্তর একের পর এক জমে উপরের দিকে একটি উল্লম্ব বরফের স্তম্ভ তৈরি হয়, যাকে ভূতত্ত্বের ভাষায় স্ট্যালাগমাইট বলা হয়। এই প্রাকৃতিক বরফের স্তম্ভটিই দেখতে শিবভক্তদের পূজিত শিবলিঙ্গের মতো। মানুষের তৈরি বরফের কাঠামোর মতো নয়, এই বরফের শিবলিঙ্গ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে প্রতি বছরই তৈরি হয়, যদি আবহাওয়া অনুকূল থাকে।

স্টাডিতে আরও বলা হয়েছে, চন্দ্র মাসের প্রথমার্ধ্বে এই শিবলিঙ্গ তৈরি হতে শুরু করে। পূর্ণিমার সময় এটি সাধারণত সর্বোচ্চ আকারে পৌঁছয়। এরপর অমাবস্যার দিকে এগোতে থাকলে এর আকার ধীরে ধীরে ছোট হতে শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরে এই পরিবর্তনকে ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করা হলেও, বিজ্ঞানীদের মতে এই প্রক্রিয়ায় গুহার তাপমাত্রা এবং পরিবেশগত পরিস্থিতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ভারতের বহু ভূতাত্ত্বিক বিস্ময় প্রাচীনকাল থেকেই পুরাণ ও লোকবিশ্বাসের অংশ হয়ে উঠেছে। সেই সময়ের মানুষ প্রকৃতির অসাধারণ ঘটনাগুলিকে ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতেন। তাই ভূতত্ত্ব কোনওভাবেই ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরোধিতা করে না। বরং বিজ্ঞান শুধু ব্যাখ্যা করে কীভাবে এই প্রাকৃতিক গঠনগুলির সৃষ্টি হয়, আর সেগুলির আধ্যাত্মিক অর্থ ও গুরুত্ব নির্ধারণ করে মানুষের বিশ্বাস।

হিন্দু ধর্ম মতে, ভগবান শিব অমরনাথ গুহার মধ্যেই দেবী পার্বতীকে সৃষ্টি এবং অমরত্বের গোপন রহস্য শুনিয়েছিলেন। সেই কারণেই অমরনাথ গুহাকে হিন্দুধর্মের অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে মনে করা হয়। প্রতি বছর অনুষ্ঠিত অমরনাথ যাত্রার মূল আকর্ষণ হল গুহার ভেতরে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া বরফের শিবলিঙ্গ।

আইআইটি দিল্লির প্রাক্তন বিজ্ঞানী এবং ম্যাকগ্রো হিল ইউপিএসসি-র লেখক রবি পি আগ্রাহারি বলেন, 'বিজ্ঞান শুধু বরফের শিবলিঙ্গ কীভাবে তৈরি হয়, সেই প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা দেয়। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাখ্যা দেয় না। তাই বিজ্ঞান এবং বিশ্বাস, দুটিকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার কোনও কারণ নেই।'