
নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ আর তীব্র গরমে কার্যত পুড়ছে উত্তর ভারত। এর মধ্যেই হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের বিস্তীর্ণ পার্বত্য বনাঞ্চলে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে দাবানল। গত কয়েকদিন ধরে পাহাড়ে যেভাবে আগুন ছড়াচ্ছে, তাতে নতুন করে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবার খোদ ভারতীয় বায়ুসেনাকে (IAF) ময়দানে নামতে হয়েছে।

হিমাচল প্রদেশের সোলন এবং জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র কসোলি অঞ্চলের বনাঞ্চল এখন আগুনের গ্রাসে। বনভূমি ছাড়িয়ে এই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে স্থানীয় ফলের বাগানগুলিতেও (Orchard areas)। ক্রমাগত বাড়তে থাকা তাপমাত্রা এবং তীব্র লূ-এর জেরেই এই আগুন এত বিধ্বংসী আকার ধারণ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, আগুন নেভাতে বায়ুসেনার চপার মোতায়েন করতে হয়েছে। ভারতীয় বায়ুসেনার হেলিকপ্টারগুলি চণ্ডীগড়ের সুখনা লেক থেকে জল ভরে এনে জ্বলন্ত বনাঞ্চলের ওপর আকাশ থেকে স্প্রে করছে। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন এবং বিপর্যয় মোকাবিলা দফতর।

চলতি মরশুমে হিমাচল প্রদেশের পারদ স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ডিগ্রি ওপরে ঘোরাফেরা করছে। জানা গিয়েছে, রাজ্যের ঊনা জেলায় তাপমাত্রা ৪৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে গিয়েছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৬ ডিগ্রি বেশি। এমনকী পাহাড়ি শহর শিমলাতেও তাপমাত্রা ছুঁয়েছে ৩০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া দফতর ইতিমধ্যেই একাধিক জেলায় ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি করেছে।

হিমাচলের পাশাপাশি প্রতিবেশী রাজ্য উত্তরাখণ্ডের পরিস্থিতিও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। দেবভূমিতে একের পর এক বনাঞ্চলে আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যে এখনও পর্যন্ত ৩৯৪টি দাবানলের (Forest Fire) ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। এর জেরে প্রায় ৩৩১ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে।

উত্তরাখণ্ডের জেলাগুলির মধ্যে চমোली সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মূলত এই অঞ্চলের পাইন বা চিড় (Pine) বনাঞ্চলেই আগুন সবচেয়ে দ্রুত ছড়াচ্ছে। বনাঞ্চল ছাপিয়ে লোকালয়ের আকাশেও এখন ধোঁয়া আর ছাইয়ের মোটা আস্তরণ। ধোঁয়ায় ঢেকেছে দেরাদুন, বাগেশ্বর এবং আলমোড়া সহ সমগ্র কুমায়ুন অঞ্চল।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ইতিমধ্যেই প্রাণ কেড়েছে সাধারণ মানুষের। উত্তরাখণ্ডে দাবানলের আগুনে পুড়ে এক মহিলার মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন একজন ‘ফায়ার ওয়াচার’। পাহাড়ি অঞ্চলের তীব্র হাওয়া এই আগুনকে আরও বেশি করে উসকে দিচ্ছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (FSI) মাত্র একদিনেই প্রায় ৩০০টি ‘ফায়ার অ্যালার্ট’ জারি করেছে। পরিবেশবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি ২০১৬ সালের উত্তরাখণ্ডের সেই প্রলয়ঙ্করী দাবানলের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। সে বছর রাজ্যে প্রায় ১৬০০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৪৫৩৮ হেক্টরের বেশি বনভূমি ধ্বংস হয়েছিল এবং প্রাণ হারিয়েছিলেন ৯ জন।

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, দীর্ঘদিনের খরা, নামমাত্র বৃষ্টিপাত এবং ক্রমবর্ধমান বিশ্ব উষ্ণায়ন পাহাড়ের জঙ্গলকে বারুদের স্তূপ বানিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে চিড় বা পাইন গাছের শুকনো পাতা (Pine needles) মাটিতে পড়ে থাকায় তা সামান্য স্ফুলিঙ্গেই মারাত্মক জ্বালানির কাজ করছে।

এই বিপর্যয় কেবল বনাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই, এর জেরে হিমালয়ের গ্লেসিয়ার বা হিমবাহগুলিও চরম বিপদের মুখে। পরিবেশবিজ্ঞানীরা সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, দাবানলের কালো ধোঁয়া এবং কার্বন কণা (Black Carbon) বাতাসে ভেসে গিয়ে হিমবাহের ওপর জমছে, যার ফলে বরফ দ্রুত গলতে শুরু করতে পারে।

একদিকে যেমন বন্যপ্রাণীরা বাসস্থান হারিয়ে বিপন্ন হচ্ছে, তেমনই তীব্র ধোঁয়ায় বহু এলাকায় বাতাসের গুণগত মান (AQI) মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে। প্রভাব পড়ছে পর্যটন শিল্পেও। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন সাধারণ মানুষকে জঙ্গল এলাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা অবলম্বনের আবেদন জানিয়েছে। বর্তমানে বন দফতর, বিপর্যয় মোকাবিলা দল এবং স্থানীয় মানুষ যৌথভাবে আগুন নেভানোর লড়াই চালাচ্ছেন।