ছবি : PTI আমেরিকায় ফের ভারতকে ঘিরে চাপের আবহ তৈরি হয়েছে। রাশিয়া থেকে সস্তা অপরিশোধিত তেল কেনা দেশগুলির উপর চাপ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিল এগিয়ে চলেছে মার্কিন কংগ্রেসে। মঙ্গলবার মার্কিন হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস ২১৪-২১১ ভোটে ‘Lindsey O. Graham Sanctioning Russia and Iran Act of 2026’ বিলটি এগিয়ে দিয়েছে। বুধবার হাউসে এর চূড়ান্ত ভোট হওয়ার কথা। তার আগে গত অগাস্টে মার্কিন সেনেট ৮৬-১১ ভোটে বিলটি পাশ করেছিল। এই বিল আইনে পরিণত হলে রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণে অপরিশোধিত তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস কেনা দেশগুলির উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ট্যারিফ বসানোর ক্ষমতা পেতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বিলটি আসলে কী?
‘Lindsey O. Graham Sanctioning Russia and Iran Act’ নামে পরিচিত এই বিলের মূল লক্ষ্য ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো। রাশিয়ার নেতৃত্ব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং জ্বালানি ক্ষেত্রের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করা জাহাজগুলিকেও এই আইনের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে তথাকথিত ‘শ্য়াডো ফ্লিট’-ও রয়েছে।
এছাড়াও ইরানের জ্বালানি ক্ষেত্রকে ঘিরে থাকা ‘Iran Sanctions Act’-এর মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।এই বিলের নামকরণ হয়েছে মার্কিন রাজনীতিক লিন্ডসে ও. গ্রাহামের নামে। দক্ষিণ ক্যারোলিনার রিপাবলিকান গ্রাহাম রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞার পক্ষে ছিলেন। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলির বিরুদ্ধেও পদক্ষেপের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন তিনি।
ভারতকে ১০০% ট্যারিফ কীভাবে দিতে পারে আমেরিকা?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানেই। বিলটি আইনে পরিণত হলে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এমন দেশগুলির পণ্যের উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ট্যারিফ বসানোর ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে, যারা রাশিয়া থেকে বড় পরিমাণে অপরিশোধিত তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস কেনে। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে রাশিয়াকে সাহায্য করছে বলে চিহ্নিত দেশগুলিও এই ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে।
সেনেটে পাশ হওয়া সংস্করণে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের সবচেয়ে বড় পাঁচ ক্রেতা দেশের কথা বলা হয়েছে। পরে হাউসে আলোচনার সময় ডেমোক্র্যাটিক রিপ্রেজেন্টেটিভ স্টেনি হোয়ার একটি সংশোধনী আনেন। সেখানে ভারত, চিন, তুরস্ক, আজারবাইজান, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সিঙ্গাপুর, কাজাখস্তান এবং কিরগিজস্তানের নাম উল্লেখ করা হয়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট- এই মুহূর্তে ভারতের উপর ১০০ শতাংশ ট্যারিফ বসেনি। বিলটি পাস হলে প্রেসিডেন্টের হাতে এমন ট্যারিফ আরোপের একটি নতুন আইনি ক্ষমতা তৈরি হতে পারে। সেই ক্ষমতা ব্যবহার করা হবে কি না এবং হলে কত শতাংশ ট্যারিফ বসবে, তা পরবর্তী সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে।
ভারত কেন নজরে?
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করার পর পশ্চিমি দেশগুলি মস্কোর উপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর পর থেকেই বিশ্ববাজারে রুশ অপরিশোধিত তেলের বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন আসে। ভারত রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা হয়ে ওঠে।
ভারতের যুক্তি ছিল, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক সস্তা তেলের উৎস ব্যবহার করা জরুরি। কিন্তু ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে রাশিয়ার তেল বিক্রি থেকে হওয়া আয় মস্কোর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থ জোগাতে সাহায্য করে।
এই কারণেই রাশিয়ার তেল কেনা দেশগুলির উপর চাপ বাড়ানোর নীতি নিয়েছে আমেরিকা।
ভারতের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার পর মার্কিন প্রশাসন যদি ভারতের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করে, তাহলে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর।
ভারত থেকে আমেরিকায় যাওয়া পণ্যের উপর অতিরিক্ত ১০০ শতাংশ শুল্ক বসলে সেগুলির আমদানি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে ভারতীয় রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতায় চাপ তৈরি হতে পারে এবং মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
তবে এই প্রভাব বাস্তবে কতটা হবে, তা নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত বিলের কোন কোন ধারা আইনে পরিণত হয় এবং ট্রাম্প প্রশাসন সেই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করে তার উপর।
বিল নিয়ে আপত্তি কোথায়?
বিলটির বিরোধিতার মূল জায়গা শুধুমাত্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নয়। আমেরিকার কয়েকজন আইনপ্রণেতার আপত্তি মূলত প্রেসিডেন্টকে ট্যারিফ আরোপের কতটা বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে।
হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির সিনিয়র সদস্য এবং ডেমোক্র্যাটিক রিপ্রেজেন্টেটিভ গ্রেগরি মিক্সের বক্তব্য, এই আইন প্রেসিডেন্টকে ট্যারিফ আরোপের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ব্যাপক ক্ষমতা দিতে পারে। তিনি এমন একটি সংশোধনীর পক্ষে ছিলেন, যাতে বিস্তৃত ‘সেকেন্ডারি ট্যারিফ’-এর ব্যবস্থা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
বিলটিতে প্রেসিডেন্টকে নিষেধাজ্ঞা এবং ট্যারিফ সংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে কিছু ব্যবস্থা কার্যকর না করার সুযোগও রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
এরপর কী?
হাউসের চূড়ান্ত ভোটে বিলটি অনুমোদিত হলে পরবর্তী ধাপে এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের জন্য হোয়াইট হাউসে যেতে পারে। তবে বিলটি পাস হলেই ভারতের উপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১০০ শতাংশ ট্যারিফ কার্যকর হয়ে যাবে না।
অর্থাৎ, এখনকার পরিস্থিতিতে বিষয়টি হল- মার্কিন কংগ্রেস এমন একটি আইনি কাঠামো তৈরি করার কথা ভাবছে, যার মাধ্যমে রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনার কারণে ভারত-সহ কয়েকটি দেশের উপর ভবিষ্যতে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ট্যারিফ আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট পেতে পারেন।