
৪ রাজ্যের ২৮টি বিধান পরিষদ আসনের দ্বিবার্ষিক নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল কংগ্রেস। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র কিংবা কর্নাটক, কোনও রাজ্যেই একটি আসনেও জয় পায়নি হাত শিবির। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে কর্নাটক থেকে। সেখানে তাদেরই সরকার রয়েছে। অথচ সেই রাজ্যের ৪টি আসনেই জয় পেয়েছে BJP ও JD(S) জোট। এমনকী কংগ্রেসের দখলে থাকা একটি আসনও ছিনিয়ে নিয়েছে JD(S)।
তবে এই নির্বাচনকে ৪ রাজ্যের সামগ্রিক জনমতের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায় না। কারণ, বিধান পরিষদের কেন্দ্রগুলিতে ভোটাধিকার থাকে নির্দিষ্ট পেশার নথিভুক্ত ভোটারদের। ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত প্রভাব এবং সাংগঠনিক শক্তি এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তা সত্ত্বেও ২৮টি আসনের একটিতেও কংগ্রেসের জয় না পাওয়া নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা।
কর্নাটকে ৪টি আসনেই BJP-JD(S) জোটের জয়
কর্নাটকের ফলাফল কংগ্রেসের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের। কারণ, এখানে বিরোধী দল হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতাসীন দল হিসেবেই নির্বাচনে লড়েছিল কংগ্রেস। ২০২৩ সাল থেকে রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে কংগ্রেস সরকার। ফলে বিধান পরিষদের এই নির্বাচন ছিল সরকারের সাংগঠনিক শক্তি এবং শিক্ষক ও স্নাতক ভোটারদের মধ্যে জনসমর্থন ধরে রাখার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
মুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমার নিজেও কর্নাটকে দলের সংগঠন ও নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি মন্ত্রীদের নির্বাচনী কেন্দ্রগুলিতে প্রচারে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। গত ২৩ অক্টোবর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ফলে ফলাফলকে ক্ষমতাসীন দলের ভোটারদের সংগঠিত করার ক্ষমতার পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে বেঙ্গালুরু টিচার্স কেন্দ্র থেকে। সেখানে JD(S) প্রার্থী এপি রঙ্গনাথ ৯০৮ ভোটে পরাজিত করেছেন কংগ্রেসের বিদায়ী বিধান পরিষদ সদস্য পুট্টান্নাকে। রঙ্গনাথ পেয়েছেন ১০ হাজার ৮১০টি ভোট। অন্যদিকে, পুট্টান্নার প্রাপ্ত ভোট ৯ হাজার ৯০২। এই জয়ের ফলে কংগ্রেসের দখলে থাকা আসনটি ছিনিয়ে নিয়েছে JD(S)।
বাকি ৩টি আসনেও নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছে BJP। নর্থ-ইস্ট টিচার্স কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন শশীল জি নামোশি। ওয়েস্ট গ্র্যাজুয়েটস কেন্দ্র থেকে জয় পেয়েছেন এসভি সানকানুর এবং সাউথ-ইস্ট গ্র্যাজুয়েটস কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন কেএম সুরেশ। শশীল জি নামোশির জয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, তাঁর নির্বাচনী কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের নিজের এলাকা কালবুর্গি।
কর্নাটকে এই ফলাফলের পর রাজ্যের কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে BJP। দলের রাজ্য নেতৃত্বের দাবি, দুর্নীতি, অনিয়ম এবং প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন মানুষ। অন্যদিকে, BJP-JD(S) জোটের এই জয় আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে দুই শরিকের মনোবল বাড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২৮ সালে কর্নাটকে পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা JD(S) প্রধান এইচডি কুমারস্বামী এই জয়কে ২০২৮ সালের নির্বাচনের জনাদেশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তবে বিধান পরিষদের নির্বাচনে পরাজয়ের কারণে এখনই কর্নাটকের কংগ্রেস সরকারের অস্তিত্বের উপর কোনও প্রভাব পড়বে না। পাশাপাশি, সীমিত সংখ্যক ভোটারের এই নির্বাচনকে গোটা রাজ্যের জনমতের প্রতিফলন বলেও ধরে নেওয়া যায় না।
উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও মহারাষ্ট্রেও খারাপ ফল কংগ্রেসের
কর্নাটকের বাইরেও উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও মহারাষ্ট্রে কংগ্রেসের ফল আশানুরূপ হয়নি। তবে ৩ রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আলাদা। সেখানে কংগ্রেস ক্ষমতায় নেই। আঞ্চলিক দল, জোটের সমীকরণ এবং স্থানীয় প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
উত্তরপ্রদেশে মোট ১১টি আসনে নির্বাচন হয়েছে। সেখানে মূল লড়াই হয়েছে BJP ও সমাজবাদী পার্টির মধ্যে। মিরাট, বেরেলি-মোরাদাবাদ এবং লখনউ আসন ধরে রেখেছে BJP। অন্যদিকে, বারাণসী টিচার্স এবং আগ্রা টিচার্স কেন্দ্র থেকে জয় পেয়েছে সমাজবাদী পার্টি।
বিহারে ৮টি আসনের নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে বিভক্ত ফলাফল সামনে এসেছে। পটনা টিচার্স কেন্দ্র থেকে জয় পেয়েছে রাষ্ট্রীয় জনতা দল বা RJD। তিরহুত টিচার্স আসন দখল করেছে BJP। অন্যদিকে, দরভাঙা কেন্দ্রে জয় পেয়েছে প্রশান্ত কিশোরের জনসূরজ পার্টি। এই জয়ের মাধ্যমে প্রথমবার বিধান পরিষদে জায়গা করে নিল প্রশান্ত কিশোরের দল। সারন টিচার্স কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন নির্দল প্রার্থী রাহুল রাজ। দারভাঙায় জনসূরজ পার্টির জয়ের ফলে কংগ্রেসের বিদায়ী বিধান পরিষদ সদস্য মদন মোহন ঝা পরাজিত হয়েছেন।
মহারাষ্ট্রের ৫টি আসনে লড়াই শাসক মহাযুতি জোট এবং বিরোধী মহা বিকাশ আঘাড়ির মধ্যে। গণনার প্রাথমিক প্রবণতা অনুযায়ী, BJP-র নেতৃত্বাধীন মহাযুতি জোট এগিয়ে ছিল।
কেন গুরুত্বপূর্ণ বিধান পরিষদের এই নির্বাচন?
বিধান পরিষদের স্নাতক ও শিক্ষক কেন্দ্রগুলির নির্বাচন সাধারণ বিধানসভা নির্বাচনের থেকে আলাদা। এই কেন্দ্রগুলিতে কেবলমাত্র নির্দিষ্ট পেশার নথিভুক্ত ভোটাররাই ভোট দিতে পারেন। ব্যালট পেপার এবং পছন্দের ক্রমানুসারে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি এখানে ব্যবহৃত হয়। ফলে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ, স্থানীয় সংগঠন এবং ভোটারদের মধ্যে প্রভাব নির্বাচনে বড় ভূমিকা নেয়।
তাই এই নির্বাচনে পরাজয় মানেই যে বৃহত্তর জনসমর্থন হারানো, এমনটা বলা যায় না। তবে ৪টি রাজ্যের ২৮টি আসনের একটিতেও কংগ্রেসের জয় না পাওয়াকে উপেক্ষা করাও কঠিন। বিশেষ করে কর্নাটকের ফলাফল কংগ্রেসের কাছে বড় সতর্কবার্তা। ক্ষমতায় থেকেও ৪টি আসনে পরাজয়, তার মধ্যে নিজেদের দখলে থাকা একটি আসন হারানো, সব মিলিয়ে রাজ্যে দলের সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অন্যদিকে, ৪টি আসনেই জিতে BJP-JD(S) জোট আগামী ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নিজেদের শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পেল। আপাতত এই ফলাফল কংগ্রেসের জন্য বড় ধাক্কা হলেও জাতীয় রাজনীতিতে দলের সামগ্রিক জনসমর্থনের চূড়ান্ত মূল্যায়ন হিসেবে একে দেখা যাবে না।