ছবি : PTI সস্তায় পুষ্টিকর খাবার হিসেবে ডিম পরিচিত। কিন্তু সেই ডিম কিনতেই এখন পকেটে টান পড়ছে। গত এক বছরে ডিমের দাম ৪০ শতাংশ বেড়েছে। পোলট্রি ফার্মে প্রতি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৭ টাকায়। অন্যদিকে অনলাইন ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলিতে খুচরো দাম প্রায় ১৪ টাকায় পৌঁছেছে। ভারতে সাধারণত শীতকালে ডিমের চাহিদা বাড়ে। ফলে আগামী কয়েক মাসে এই দাম আরও বাড়তে পারে বলে দাবি করছেন পোলট্রি শিল্পের সঙ্গে যুক্তদের একাংশ। কিন্তু কেন এত বাড়ছে দাম? বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ডিম ও পোলট্রির দাম বৃদ্ধির পিছনে রয়েছে ইথানলের যোগ।
পোলট্রি ফিড বা মুরগির খাবার তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভুট্টা। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইথানল বানানোর জন্য ভুট্টার ব্যবহার বেড়েছে। ফলে ভারতে উৎপাদিত ভুট্টার একটি অংশ পোলট্রি ফিডে যাওয়ার পরিবর্তে E20 পেট্রোল তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। তার জেরে পোলট্রি ফিডের খরচ বাড়ছে এবং তার প্রভাব পড়ছে ডিমের দামে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের।
ফিটনেস ইনফ্লুয়েন্সার চিরাগ বারজাতিয়াও ডিমের দাম বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগে প্রকাশ করেছেন। X-এ লিখেছেন, 'এখন প্রতি পিস ডিম ৯ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৪০ শতাংশ দাম বেড়েছে।' তাঁর দাবি, হুই প্রোটিনের দাম প্রতি কেজি প্রায় ৪,২০০ টাকা এবং হাই-প্রোটিন পনিরের দাম প্রায় ১৮০ টাকা। এতে উচ্চ-প্রোটিনযুক্ত খাবারের খরচ ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে নিরামিষ ভোজীদের জন্য এই খরচ আরও বেশি। প্রতিদিন ১০০ গ্রাম প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করতে মাসে প্রায় ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।
কম্পাউন্ড লাইভস্টক ফিড ম্যানুফাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান দিব্য কুমার গুলাটি জানিয়েছেন, পোলট্রি ফিডের প্রায় ৫০-৫৫ শতাংশই হল ভুট্টা। বাকি প্রধান উপাদানগুলির মধ্যে রয়েছে সয়াবিন। ফলে এই দুই উপাদানের দাম সরাসরি ডিম ও মুরগির উৎপাদন খরচের উপর প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, সরকার দ্রুত ইথানল পেট্রোলের সম্প্রসারণ করার উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এতে ভুট্টার উপর চাপ বেড়েছে। আগে যে বিপুল পরিমাণ ভুট্টা সাধারণত ফিড প্রস্তুতকারকদের হাতে যেত, তার একটি বড় অংশ এখন ইথানল তৈরির কারখানায় যাচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলিও ডিমের দাম বৃদ্ধির জন্য ইথানলকেই দায়ি করছে। যেমন সমাজবাদী পার্টি বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করে অভিযোগ করেছে, ইথানল উৎপাদনের জন্য ভুট্টার ব্যবহারই দায়ি।
এক্স হ্যান্ডেলে তারা লিখেছে, 'বিজেপির ভুল ইথানল নীতির কারণে গরিবের সস্তা প্রোটিনের উৎস ডিমও এখন কেনা যাচ্ছে না। গরিবরা পাতে রাখতে পারছে না। ডিম, চিনি-সহ সবকিছুর দাম বাড়ছে।'
কতটা ভুট্টা ইথানল তৈরির কারখানায় যাচ্ছে?
২০২৫ সালে কেন্দ্রীয় ভোক্তা বিষয়ক, খাদ্য ও গণবণ্টন মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী নিমুবেন জয়ন্তভাই বাম্ভানিয়ার লোকসভায় দেওয়া এক উত্তরে জানিয়েছিলেন, ২০২৪-২৫ সালে ইথানল উৎপাদনে ১২৫.৭৫ লক্ষ মেট্রিক টন ভুট্টা ব্যবহার করা হয়েছিল। ওই বছরে ভুট্টা-ভিত্তিক ডিস্টিলারিগুলিকে মোট ৪৭৭.৮ কোটি লিটার ইথানল তৈরির জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
এই বৃদ্ধি অত্যন্ত দ্রুত হয়েছে। মাত্র দুই বছরে ইথানল উৎপাদনে ভুট্টার ব্যবহার ৮.৩ লক্ষ টন থেকে বেড়ে ১২৫.৭৫ লক্ষ টনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বৃদ্ধি হয়েছে ১৫ গুণেরও বেশি।
এই বিপুল বৃদ্ধির ফলে ভারতের ইথানল শিল্পের কাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে। EBP কর্মসূচির অধীনে শস্য-ভিত্তিক ইথানল উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইথানল তৈরির একক বৃহত্তম কাঁচামাল হিসেবে ভুট্টা উঠে এসেছে। অন্যান্য পৃথক কাঁচামালকে পিছনে ফেলেছে ভুট্টা।
ভুট্টা রফতানিকারক দেশ থেকে আমদানিকারক ভারত?
ভারতে ভুট্টার উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই শস্যের জন্য প্রতিযোগিতামূলক চাহিদাও বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ সালে ভারতে ভুট্টার উৎপাদন ছিল ৩১৬ লক্ষ টন। ২০২৪-২৫ সালে তা বেড়ে হয় ৪৩৪ লক্ষ টন। কিন্তু উৎপাদন বাড়ার পরও ভুট্টার দামের উপর চাপ কমেনি। কারণ, ইথানল, পোলট্রি ফিড, স্টার্চ-সহ একাধিক শিল্প একই ফসলের জন্য প্রতিযোগিতা করছে।
আবার ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে ভারত প্রায় ৩৪.৫৩ লক্ষ টন ভুট্টা রফতানি করেছিল। পরের অর্থবর্ষে সেই রফতানি কমে দাঁড়ায় ১৪.৪২ লক্ষ টনে। অর্থাৎ প্রায় ৫৮ শতাংশ পতন। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে রফতানি আরও কমে মাত্র ৫.৫৬ লক্ষ টন হয়।
অন্যদিকে, ভুট্টার আমদানিও বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে ভারত প্রায় ১.৩৭ লক্ষ টন ভুট্টা আমদানি করেছিল। পরের বার তা বেড়ে হয়েছে ৯.৭০ লক্ষ টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৬০০ শতাংশেরও বেশি। এর অর্থ হল, ভুট্টার উৎপাদন বাড়লেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ভারত নেট ভুট্টা আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে।
ভুট্টার দাম বাড়লে ডিমের দামেও কেন তার প্রভাব পড়ছে?
পোলট্রি শিল্পের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুট্টা শুধু পোলট্রি ফিডের আর পাঁচটা উপাদানের মতো নয়। এটি পোলট্রির খাবারে শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস।
ভুট্টার দাম বেড়ে গেলে ফিড প্রস্তুতকারকদের কাছে উৎপাদন খরচের সেই বাড়তি চাপের অন্তত একটি অংশ পরবর্তী ধাপে পৌঁছে দেওয়া ছাড়া বিশেষ উপায় থাকে না। বাজারের দামেও সেই চাপের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
২০২৪ সালে দেশের গড় পাইকারি ভুট্টার দাম মোটামুটি প্রতি কুইন্টালে ২,১৫০-২,৩৭০ টাকার মধ্যে ছিল। ২০২৫ সালে কিছু জায়গায় দাম প্রতি কুইন্টালে ২,৪০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
২০২৬ সালে প্রথম দিকে ভুট্টার দাম কিছুটা কমেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মান্ডিতে আবার দাম প্রতি কুইন্টালে প্রায় ২,৩০০- ২,৬৪৫ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিভিন্ন বাজারে দামের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
পোলট্রি শিল্পের সমস্যা তাই শুধু ভুট্টার দাম বেশি হয়ে যাওয়া নয়। আসল সমস্যা হল, একই ফসল ক্রমশ একটি নতুন এবং দ্রুত বাড়তে থাকা বাজারের দিকে চলে যাচ্ছে।
ইথানলের জন্য বেশি ভুট্টা ব্যবহার করা হলে পোলট্রি ফিডের জন্য প্রতিযোগিতা করার মতো ভুট্টার পরিমাণ কমে যায়। যদি না একই সঙ্গে উৎপাদনও যথেষ্ট হারে দ্রুত বাড়ে। যাতে দুই ক্ষেত্রের চাহিদা পূরণ করা যায়। এই ভারসাম্য যখন আরও কঠিন হয়ে যায়, তখন তার প্রভাব ভুট্টার মান্ডি থেকে ফিড মিল এবং শেষ পর্যন্ত একটি ডিমের দামেও পৌঁছে যেতে পারে।
ভারতে ডিমের দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা কেন?
ডিম উৎপাদনের মোট খরচের একটি বড় অংশই হল পোলট্রি ফিড। শিল্পমহলের হিসাব অনুযায়ী, ডিম উৎপাদনের মোট খরচের প্রায় ৬৫–৭০ শতাংশ পর্যন্ত ফিডের পিছনে যায়। ফলে ভুট্টা ও সয়াবিনের দামের ওঠানামার প্রতি পোলট্রি শিল্প অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে ডিমের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে ইথানল কর্মসূচির যোগসূত্র এতটা গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারতে ডিম উৎপাদনও বাড়ছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে উৎপাদন বৃদ্ধির হার কিছুটা কমেছে।
২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ সালের মধ্যে ডিম উৎপাদন বছরে প্রায় ৬–৭ শতাংশ হারে বাড়ছিল। কিন্তু পরের অর্থ বছরে বৃদ্ধির হার কমে দাঁড়ায় ৩.১৮ শতাংশে। ২০২৪-২৫ সালে তা হয় ৪.৪৪ শতাংশ। তা সত্ত্বেও ২০২৪-২৫ সালে ভারতের মোট ডিম উৎপাদন রেকর্ড ১৪৯.১১ বিলিয়ন বা ১৪৯১.১ কোটি ডিমে পৌঁছেছে।
এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, সাধারণত শীতের মাসগুলিতে ভারতে ডিমের ব্যবহার বাড়ে। তাপমাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি, হোটেল, রেস্তরাঁ এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের কাছ থেকে ডিমের চাহিদা বাড়তে থাকে।
যদি একই সময়ে পোলট্রি ফিডের খরচ বেশি থাকে এবং ডিমের চাহিদাও বাড়ে, তাহলে পোলট্রি খামারিদের উপর দামের আরও একটি দফা চাপ তৈরি হতে পারে। তাই দাম আরও বাড়তে পারে।
ডিমের দাম বৃদ্ধির একমাত্র কারণ কি ইথানল?
ইথানলের জন্য ভুট্টার ব্যবহার বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ভুট্টার অতিরিক্ত চাহিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু ডিমের দাম বৃদ্ধির জন্য ইথানলকেই একমাত্র দায়ী করা হবে, বিষয়টি এতটাও সরল নয়। ভুট্টার দাম আরও বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদন, আবহাওয়া, বাজারে ফসলের আগমন, মজুত, রফতানি এবং আমদানি। পোলট্রি ফিডে সয়াবিন মিলও ব্যবহার করা হয়। ফলে সয়াবিনের দামও স্বাধীনভাবে পোলট্রি উৎপাদন খরচকে প্রভাবিত করতে পারে। এছাড়াও ডিমের দাম নির্ভর করে মৌসুমি চাহিদা, পোলট্রি ফার্মে মুরগির সংখ্যা, রোগের প্রাদুর্ভাব এবং বিভিন্ন অঞ্চলের সরবরাহ পরিস্থিতির উপর।
সরকারের অবস্থান হল, ইথানল, পোলট্রি এবং অন্যান্য ব্যবহারের জন্য দেশে পর্যাপ্ত ভুট্টা রয়েছে। কেন্দ্র উৎপাদন বৃদ্ধির কথাও তুলে ধরেছে এবং সেটিকে দেশে ভুট্টার সরবরাহ বাড়ার প্রমাণ হিসেবে দেখিয়েছে। তাই শুধুমাত্র ইথানল উৎপাদনের কারণেই ডিমের দাম বেড়েছে- এই যুক্তির চেয়ে বরং বলা যায়, ইথানলের জন্য ভুট্টার দ্রুত ব্যবহার বৃদ্ধি এমন একটি বাজারে অতিরিক্ত চাহিদার বড় উৎস তৈরি করেছে, যেখানে আগে থেকেই একাধিক ক্ষেত্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ইথানল উৎপাদনের জন্য কোনও কৃষিপণ্যের ব্যবহার অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়াকে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির জন্য দায়ী করার ঘটনা এই প্রথম নয়। ইথানল উৎপাদনের জন্য আখের ব্যবহার বাড়ানোকে গত সপ্তাহে চিনির দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছনোর অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়েছিল।
ডিমের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অবশ্য ভুট্টার যোগসূত্র আরও স্পষ্ট। কারণ ভুট্টা পোলট্রি ফিডের অন্যতম প্রধান উপাদান এবং ইথানল শিল্প এখন সেই একই ফসলের জন্য পোলট্রি শিল্পের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করছে।
গত পাঁচ বছরের তুলনায় ভারত এখন বেশি ভুট্টা উৎপাদন করছে। কিন্তু একই সঙ্গে উৎপাদিত প্রতিটি টন ভুট্টার জন্য ব্যবহারের ক্ষেত্রও বাড়ছে। অর্থাৎ, ভারত ভুট্টা বেশি উৎপাদন করছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে সেই ভুট্টার দাবিদারও বাড়ছে। ইথানল শিল্প ও পোলট্রি শিল্পের এই প্রতিযোগিতাই শেষ পর্যন্ত কতটা চাপ ফেলবে ডিমের দামে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।