আরাবল্লি পর্বতপ্রায় ২.৫ বিলিয়ন বছর ধরে দেশের বিশাল অংশকে মরুভূমির তাপ থেকে রক্ষা করছে আরাবল্লি। রাজস্থান, হরিয়ানা, গুজরাত ও দিল্লির মতো এলাকাকে অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে রক্ষা করছে আরাবল্লি পাহাড়।কারণ থর মরভূমির বাতাস যখন হু হু করে উত্তর ভারতে প্রবেশ করতে ধেয়ে আসে, তখন আরাবল্লি পর্বতমালা এর মাঝে দুর্ভেদ্য পাঁচিল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু এই আরাবল্লিই এখন বিপদে। হ্যাশট্যাগ শুরু হয়েছে Save Aravalli.
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রকের একটি কমিটির সুপারিশ গ্রহণের পর সুপ্রিম কোর্ট আরাবল্লি পাহাড় এবং আরাবল্লি পর্বতমালার একটি নতুন সংজ্ঞা জারি দিয়েছে। বলা হয়েছে, আরাবল্লি জেলায় পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে ১০০ মিটার বা তার বেশি উঁচু জমিই আরাবল্লি পাহাড়ের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
কিন্তু গোলযোগ বেঁধেছে অন্য বিষয়ে। সুপ্রিম নির্দেশ মানা হলে বর্তমান আরাবল্লি অঞ্চলের প্রায় ৯০ শতাংশ আরাবল্লি এলাকা থেকে বাদ পড়বে এবং সেগুলি আরাবল্লি হিসেবে বিবেচিত হবে না। ফলে ভবিষ্যতে যদি এখানে খনন বা অন্যান্য নির্মাণ কাজ শুরু হয়, তাহলে এই পাহাড়গুলি অদৃশ্য হয়ে যাবে, আরাবল্লি পাহাড়ের মাত্র ১০ শতাংশ অক্ষত থাকবে। ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ শুরু করে বিভিন্ন NGO থেকে শুরু করে স্থানীয় গ্রামের মানুষেরাও। পাশাপাশি রাজনৈতিক ময়দানেও বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে কেন্দ্রকে। কংগ্রেস সাংসদ সোনিয়া গান্ধীও দাবি করেছেন, মোদী সরকার এই পাহাড়গুলির জন্য কার্যত "মৃত্যু পরোয়ানা" জারি করেছে।
তবে আজ, সোমবার বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্র নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বনমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব আরাবল্লি পর্বতমালা সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়কে ঘিরে তৈরি গুজব এবং ভুল তথ্য মানতে নারাজ। তিনি দাবি করেছেন, "আরাবল্লি পর্বতমালা আমাদের দেশের প্রাচীনতম পর্বতমালা। মোদী সরকার সবসময়ই আরাবল্লি অঞ্চলে সবুজায়নকে উৎসাহিত করেছে । কিছু লোক ইচ্ছাকৃতভাবে আদালতের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে, কিন্তু আমি রায়টি মনোযোগ সহকারে পড়েছি। আমি স্পষ্ট করে বলছি, কোনও ছাড় দেওয়া হয়নি।"
ভূপেন্দ্র যাদব জানান, সুপ্রিম কোর্ট দিল্লি, গুজরাত, রাজস্থান এবং হরিয়ানায় অবস্থিত আরাবল্লি পর্বতমালা রক্ষার জন্য বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে রায় দিয়েছে। খনির এলাকা সীমিত করার জন্য একটি প্রযুক্তিগত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বিষয়টির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, "১০০ মিটারের বিষয়টি 'উপর থেকে নিচ পর্যন্ত' প্রযোজ্য। অর্থাৎ আশেপাশের জমির ১০০ মিটার বা তার বেশি উঁচু যে কোনও ভূমিরূপকে আরাবল্লি পাহাড় হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর ফলে পুরো ঢাল পর্যন্ত এলাকা সুরক্ষিত থাকবে। যদি দুটি পাহাড় ৫০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকে, তাহলে এর মধ্যবর্তী এলাকাটিও আরাবল্লি পর্বতমালার অংশ হবে। এসব এলাকায় কোনও খনির অনুমতি নেই। রায়ের ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে অপরিহার্য প্রয়োজন ছাড়া কোনও নতুন খনির ইজারা দেওয়া হবে না।"
মন্ত্রীর দাবি, আরাবল্লিতে ২০টি বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য এবং চারটি বাঘ সংরক্ষণাগার রয়েছে। এগুলি সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত থাকবে। মোট আরাবল্লি এলাকা প্রায় ১.৪৪ লক্ষ বর্গকিলোমিটার, যার মধ্যে মাত্র ০.১৯ শতাংশ খনির জন্য উপযুক্ত। ৯০ শতাংশেরও বেশি এলাকা সংরক্ষিত অঞ্চলের মধ্যে পড়বে।
তবে মন্ত্রীর ব্যাখ্যার পরেও জল্পনা কমছে না। নীলম আহলুওয়ালিয়া জানাচ্ছেন, রাজস্থানের বেশিরভাগ অংশে আরাবল্লি পর্বতমালার বেশিরভাগ অংশ ১০০ মিটারেরও কম উঁচু। সেখানে গড় উচ্চতা ৫০-৮০ মিটার। ফলে এই সিদ্ধান্তের ফলে এখানে পাহাড়ের সুরক্ষা থাকছে না।
আরাবল্লি যদি ভারতে না থাকত তাহলে কী হত?
রাজস্থানের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আরাবল্লি পর্বতমালার দীর্ঘদিনের গবেষক ডক্টর লক্ষ্মীকান্ত শর্মা জানাচ্ছেন, "আরাবল্লি পর্বতমালা জন্য আগে একটি সুরক্ষা পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু এবার তা ঘটেনি। এবার, উচ্চতা ভূমি থেকে পরিমাপ করা হয়েছিল। সবসময় উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পরিমাপ করা হয়, কিন্তু এবার তা হয়নি। পাহাড়ের ক্ষেত্রে যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়, তা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতার সংজ্ঞা অবস্থানের উপর ভিত্তি করেই হত, কিন্তু তা হয়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, প্রাচীনতম পর্বতমালা হওয়ায়, এর সঠিক পরিসর নির্ধারণ করা কঠিন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আরাবল্লি পর্বতমালা ভূমি থেকে যতটা লম্বা, ততটাই ভূগর্ভস্থও হতে পারে।"
আরাবল্লি রক্ষার দাবিতে আন্দোলন চলছে
হরিয়ানার বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদে সরব হয়েছেন স্থানীয়েরা। বিভিন্ন NGO এই আন্দোলনগুলিতে শামিল হয়েছেন। পাশাপাশি ব্যাপক আন্দোলন শুরু করেছেন পরিবেশ কর্মীরাও। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেও #SaveAravalli ট্রেন্ডিং চলছে। যার জেরে কিছুটা বেকায়দায় পড়েছে সরকারও।