রাজ ঠাকরেকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই করার সিদ্ধান্তে যে উদ্ধবের ক্ষতিই হয়েছে, তা এই ফলাফলেই স্পষ্ট।BMC নির্বাচনে শিবসেনা ইউবিটি ভরাডুবি। এই প্রথমবার 'ঠাকরেহীন' হচ্ছে বিএমসি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে ঠাকরে আবেগই কার্যত 'ব্যাকফায়ার' করেছে। মুম্বই পুরসভার ভোটে মহাযুতি; বিজেপি ও একনাথ শিন্ডের শিবসেনা সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগোচ্ছে বলেই ইঙ্গিত। অন্যদিকে উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা ইউবিটির পরিস্থিতি খুব খারাপ। রাজ ঠাকরেকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই করার সিদ্ধান্তে যে উদ্ধবের ক্ষতিই হয়েছে, তা এই ফলাফলেই স্পষ্ট।
শুধু বিএমসি নয়, গোটা মহারাষ্ট্রেই একই ছবি। রাজ্যের ২৯টি পুরসভায় বিজেপির দাপট ক্রমেই বাড়ছে। কেন্দ্র ও রাজ্য; দুই সরকারেই শরিক একনাথ শিন্ডের শিবসেনা। তারাও নিজেদের এলাকায় জিতছে। মোট ২,৮৬৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১,৫৫৩টিতে জয়ের পথে। তার মধ্যে প্রায় অর্ধেক ওয়ার্ডে বিজেপি এগিয়ে। ফলে শিবসেনাকে ধরলে মহাযুতির হাতে দু’-তৃতীয়াংশেরও বেশি ওয়ার্ড এসে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, পুরনির্বাচনের ফলেও বিধানসভারই ট্রেন্ড জারি থাকছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এতদিন ঠাকরে ভাইদের মূল USP ই ছিল 'মারাঠি অস্মিতা'। সেটায় ভর করেই একসময় একছত্র দাপট ছিল। কিন্তু সময় বদলেছে। পাল্টে গিয়েছে জনবিন্যাসও। মারাঠি অস্মিতার বড়ি আর গিলতে নারাজ ভোটাররা। কিন্তু এবারেও আগের মতোই সেই মারাঠি অস্মিতার স্ট্র্যাটেজিতেই প্রচার চালায় ঠাকরে ভাইরা। তাতে যে খুব একটা লাভ হয়নি, তা ভোটের ফলাফলেই স্পষ্ট।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, মারাঠি ভোটের বিভাজনও হয়েছে। অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়ার সমীক্ষা অনুযায়ী, ঠাকরে শিবির মারাঠি ভোটারদের মধ্যে ৪৯ শতাংশ ভোট পেতেই পারে। কিন্তু তাতে লাভ হবে না। কেন? কারণ, মুম্বইয়ে মারাঠি ভোটারের মোট হার মাত্র ৩৮ শতাংশ।
অর্থাৎ মারাঠি ছাড়াও উত্তর ভারতীয়, গুজরাতি এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের ভোটারদের সংখ্যা প্রচুর। অর্থাৎ এই ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ভোটারদের ভোট বিজেপির দিকে যাচ্ছে।
অর্থাৎ, বিজেপি-শিবসেনার জোট এই অ-মারাঠি ভোটারদের একত্রিত করে ফেলেছে।
অ-মারাঠিদের মারাঠি বলতে বাধ্য করা, ইংরাজি-হিন্দিতে লেখা দোকান, সাইনবোর্ডে ভাঙচুরের মতো ঘটনাগুলিও ভালভাবে নেননি অমারাঠিরা। এমনকি মারাঠিদের একাংশও এই উগ্রতাকে গ্রহণ করেননি। স্বাভাবিকভাবেই ঠাকরে ভাইদের প্রত্যাখান করেছেন তাঁরা।
রাজ ঠাকরের দলের সঙ্গে জোট করেই কি উদ্ধব ফলস্ খেয়ে গেলেন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই জোটের সিদ্ধান্তই উদ্ধবের সবচেয়ে বড় ভুল। এমএনএস আগেই দুর্বল অবস্থায় ছিল। স্থানীয় নির্বাচনেই তারা খাতা খুলতে পারেনি। সেই দলের সঙ্গে জোট করে যে কোনও লাভ হবে না, তা যে কোনও সাধারণ ব্যক্তিরই বোঝগম্য। এমতাবস্থায় কংগ্রেসকে ছেড়ে কেন রাজ ঠাকরের সঙ্গে হাত মেলানো হল? উদ্ধব শিবিরের মধ্যেও এই নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
কংগ্রেসের সঙ্গে জোট না থাকায় সংখ্যালঘু ভোটও হাতছাড়া হয়েছে। উদ্ধব ঠাকরে কার্যত না পুরোপুরি হিন্দু ভোট পেয়েছেন, না মুসলিম ভোট। কংগ্রেস মুম্বইয়ে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালীই ছিল। সেই ভোট শিবসেনা ইউবিটির ঝুলিতে আসতে পারত। কংগ্রেসের সংগঠন যেখানে তুলনামূলকভাবে মজবুত, সেখানে এমএনএস সাংগঠনিক দিক থেকেও দুর্বল। ফলে সম্ভাব্য ভোটের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।
এর পাশাপাশি 'ঠাকরে ব্র্যান্ড' এর ক্ষয়ও একটি বড় কারণ। ২০২২ সালে শিবসেনায় ভাঙনের পর উদ্ধব শিবির 'আসলি শিবসেনা' সেভাবে স্বীকৃতি পায়নি। ধনুক-বাণ চিহ্ন চলে যায় শিন্ডে গোষ্ঠীর হাতে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয় যে, ঠাকরে পরিবার আর আগের মতো নেই। তরুণ ভোটারদের সংখ্যাও বেড়়েছে। তাদের মধ্যেও 'ঠাকরে' নাম নিয়ে তেমন কোনও 'ফ্যাসিনেশন' নেই। ফলে ১৮-২৫ বছর বয়সি ভোটারদের বড় অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে।
অন্যদিকে, এই দূর্বল প্রতিপক্ষের ফায়দা তুলেছে মহাযুতি। মূল ইস্যু হিসাবে কেন্দ্রীয় প্রকল্প, উন্নয়ন এবং 'এক দেশ এক নির্বাচন' নিয়ে প্রচার চালানো হয়। সেটাই কাজে লেগেছে।
বিএমসি নির্বাচনে ঠাকরে ভাইদের এই দুর্দশার নেপথ্যে একাধিক কারণ থাকতেই পারে। তবে সর্বোপরি রাজ ঠাকরে আবেগের যে ইতি ঘটেছে, তা এই ফলাফলেই স্পষ্ট বলে মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের।