ব্রীজভূষণ সিংবেকসুর খালাস পেলেন প্রাক্তন ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের (ডব্লুএফআই) সভাপতি ব্রিজভূষণ শরণ সিং। ছয় মহিলা কুস্তিগির তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। তবে সেই মামলায় তাঁকে বেকসুর খালাস করেছে দিল্লির একটি আদালত।
দিল্লির আদালতে বেকসুর খালাস পাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইন্ডিয়া টুডে-কে দেওয়া সাক্ষাৎকার দেন ব্রিজভূষণ শরণ সিং। তিনি দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে একটি 'সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র' করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, 'আমার বিশ্বাস, আমার বিরুদ্ধে একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। এতে শুধু কয়েকজন কুস্তিগিরই নয়, একাধিক রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিক নেতাও জড়িত ছিল। সেই সময় যারা আমাকে দোষী বলে মনে করেছিলেন, তাদের এখন নিজেদের আত্মসমালোচনা করা উচিত।'
এখানেই থেমে না থেকে তাঁর আরও মন্তব্য, 'আমি প্রথম দিন থেকেই বলে এসেছি, আমার বিরুদ্ধে আনা একটি অভিযোগও যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে আমি শাস্তি পেতে প্রস্তুত। নিজের উপর আমার সবসময় পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। কারণ, আমি জানি আমি কী। আজ আমার মনে হচ্ছে, আমার সেই কথাই সত্যি প্রমাণিত হয়েছে।'
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের ইতি
সোমবার দিল্লির আদালত ছয়জন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা কুস্তিগিরের যৌন হেনস্তার মামলায় ব্রিজভূষণ শরণ সিংকে খালাস দেয়। ভারতের ক্রীড়াজগতের অন্যতম আলোচিত এই মামলায় অভিযোগ ছিল, ডব্লুএফআই-এর প্রধান থাকাকালীন তিনি একাধিক মহিলা কুস্তিগিরকে যৌন হেনস্তা করেছিলেন। কিন্তু প্রথম থেকেই এই সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে এসেছেন ব্রিজভূষণ।
২০২৩ সালে দেশজুড়ে আন্দোলন
যৌন হেনস্তার অভিযোগ ঘিরেই ২০২৩ সালে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। অলিম্পিক পদকজয়ী ও তারকা কুস্তিগির বিনেশ ফোগাট, সাক্ষী মালিক এবং বজরং পুনিয়া সহ একাধিক কুস্তিগির দিল্লির যন্তর মন্তরে মাসের পর মাস অবস্থান বিক্ষোভ করেন। তাঁদের দাবি ছিল, ব্রিজভূষণকে গ্রেফতার করতে হবে। ডব্লুএফআই-এর প্রধানের পদ থেকে সরাতে হবে।
পরবর্তীতে নতুন সংসদ ভবনের দিকে মিছিল করার সময় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের আটক করে। তখন সেই ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক আলোড়ন ফেলে। একাধিক আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থার সমালোচনার মুখে পড়ে ভারত।
অভিযোগের সূত্রপাত
এই মামলার অন্যতম অভিযোগকারী ছিলেন কুস্তিগির বিনেশ ফোগাট। আসলে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ভিনেশ ফোগাট, সাক্ষী মালিক, বজরং পুনিয়া সহ ভারতের শীর্ষ কুস্তিগিররা যন্তর মন্তরে আন্দোলন শুরু করেন। অভিযোগ ছিল, ব্রিজভূষণ তাঁদের যৌন হেনস্তা করেছেন। সেই সময় তাঁকে পদ থেকে অপসারণের দাবিও তোলেন তাঁরা।
তৎকালীন কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরের সঙ্গে বৈঠকের পর ২০২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি কেন্দ্র একটি তদারকি কমিটি গঠন করা হয়। তাতে আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত হয়। তবে কুস্তিগিরদের অভিযোগ ছিল, ওই কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এফআইআর থেকে চার্জশিট
২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে ছয়জন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা কুস্তিগির কনট প্লেস থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন। এরপর তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। এফআইআর দায়েরের আবেদন করেন।
দিল্লি পুলিশ সুপ্রিম কোর্টকে ব্যবস্থা নিতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৩ সালের ২৮ এপ্রিল ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে দুটি এফআইআর দায়ের করা হয়। একটি এফআইআর ছিল ছয়জন প্রাপ্তবয়স্ক অভিযোগকারীর অভিযোগের ভিত্তিতে, যেখানে যৌন হেনস্তা, শ্লীলতাহানি এবং স্টকিং-এর ধারায় মামলা হয়। অন্যদিকে, এক নাবালিকা কুস্তিগিরের অভিযোগের ভিত্তিতে পকসো (পকসো) আইনে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়।
আদালতের রায়
২০২৩ সালের ১৫ জুন দিল্লি পুলিশ প্রাপ্তবয়স্ক অভিযোগকারীদের মামলায় চার্জশিট জমা দেয়। একই সঙ্গে নাবালিকা কুস্তিগিরের পকসো মামলায় ক্লোজার রিপোর্টও দাখিল করে।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করার পর বিচারপর্ব শুরু হয়। ২০২৪ সালের মে মাসে ব্রিজভূষণ শরণ সিং এবং ডব্লুএফআই-এর প্রাক্তন সহকারী সম্পাদক বিনোদ তোমার-এর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়। দু'জনেই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন।
বিচার চলাকালীন মোট ৩২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। তারপর ২০২৬ সালের মে মাসে প্রমাণ জোগারের কাজ শেষ শেষ হয়। জুন মাসে অভিযুক্তদের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়। ২০২৬ সালের ২ জুলাই চূড়ান্ত শুনানি শেষ হয়।