Photo - ITG চিনের কাছে ১৮০০-র বেশি যুদ্ধবিমান রয়েছে। ভারতের হাতে তার তুলনায় কম। তা সত্ত্বেও আকাশযুদ্ধে ভারত একাধিক ক্ষেত্রে সুবিধা পেতে পারে। এমনটাই দাবি করছেন ভারতীয় বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল এপি সিং। তাঁর মতে, এর প্রধান কারণ হল তিব্বতের উচ্চতা। সেখানে চিনা বিমানঘাঁটি থাকলেও তা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেকটা উঁচুতে। ফলে পরিচালনা করা কঠিন। তাই চিনা বিমানের সক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। সেই বিমানগুলি স্বাভাবিক উচ্চতায় যে পরিমাণ অস্ত্র বহনে সক্ষম, তা নাও পারতে পারে ওই উচ্চতায়। ফলে তিব্বতের উচ্চতা চিনের বিমানের রেঞ্জও প্রভাবিত করবে।
অন্যদিকে, ভারতের বিমানঘাঁটিগুলি সমতলে অবস্থিত। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানঘাঁটির উচ্চতা যুদ্ধবিমানের কর্মক্ষমতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। সেই দিক থেকে ভারতের সমতল এলাকার বিমানঘাঁটিগুলি কিছু কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে। তবে আকাশযুদ্ধে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে শুধু বিমানঘাঁটির অবস্থান নয়, যুদ্ধবিমানের প্রযুক্তি, অস্ত্র, পাইলটদের দক্ষতা এবং সামরিক প্রস্তুতির উপরও তা নির্ভরশীল।
তিব্বতের উচ্চতা চিনের জন্য কেন চ্যালেঞ্জ?
তিব্বত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেকটা উঁচুতে অবস্থিত। উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের ঘনত্ব কমে যায়। ফলে যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা, ডানা থেকে তৈরি হওয়া উত্তোলন বল এবং উড়ানের সামগ্রিক কার্যকারিতার উপর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বিমান যখন ভারী অস্ত্র ও অতিরিক্ত জ্বালানি নিয়ে উড়তে চায়, তখন এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
উঁচু বিমানঘাঁটি থেকে ওড়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমানকে তুলনামূলক কম অস্ত্র নিয়ে উড়তে হতে পারে। এর ফলে হামলার ক্ষমতা, উড়ানের দূরত্ব এবং অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনায় প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে এই প্রভাব সব বিমানের ক্ষেত্রে একরকম নয়। বিমানের নকশা, ইঞ্জিনের ক্ষমতা, আবহাওয়া এবং রানওয়ের দৈর্ঘ্যের মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া যুদ্ধবিমান একবার অভিযান চালিয়ে ফিরে আসার পর তাকে ফের উড়ানের জন্য প্রস্তুত করতে হয়। জ্বালানি ভরা, অস্ত্র সংযোজন, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রস্তুতি শেষ করতে সময় লাগে। উচ্চতার কারণে বিমান পরিচালনায় কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হলে এই প্রক্রিয়াও জটিল হতে পারে।
ভারতের সমতল এলাকার বিমানঘাঁটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের অম্বালা, বঠিণ্ডা, সিরসা এবং চাবুয়ার মতো বিমানঘাঁটি দেশের বিমান প্রতিরক্ষা ও সামরিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সমতল এলাকার বিমানঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে তুলনামূলক অনুকূল বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতি পাওয়া যেতে পারে। এর ফলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বেশি অস্ত্র ও জ্বালানি নিয়ে উড়ান সম্ভব হতে পারে।
ভারতীয় বায়ুসেনার জন্য এই সুবিধা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সীমান্তবর্তী এলাকায় দ্রুত অভিযান চালানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যুদ্ধবিমানকে বারবার ব্যবহার করার ক্ষমতা সামরিক কৌশলের অন্যতম অংশ। তবে শুধু কম উচ্চতায় অবস্থিত বিমানঘাঁটি থাকলেই যে কোনও অভিযানে ভারত বাড়তি সুবিধা পাবে, এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বিমানঘাঁটির পরিকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা, গোলাবারুদের মজুত এবং যুদ্ধবিমানকে দ্রুত প্রস্তুত করার ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
তিব্বতে চিনের একাধিক উচ্চতায় অবস্থিত বিমানঘাঁটি
চিনও তিব্বত ও সংলগ্ন অঞ্চলে সামরিক পরিকাঠামো শক্তিশালী করেছে। নগারি গুনসা বিমানঘাঁটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,২৭৪ মিটার এবং কোয়ামডো বাংদা বিমানঘাঁটি প্রায় ৪,৩৩৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ধরনের উচ্চতায় বিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ থাকলেও চিনের সামরিক সক্ষমতাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। চিন বিমানঘাঁটির পরিকাঠামো উন্নত করেছে এবং উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালনার উপযোগী ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়েছে। ফলে শুধু বিমানঘাঁটির উচ্চতা বিচার করে চিনের যুদ্ধবিমান কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
চিনের হাতে বেশি যুদ্ধবিমান, ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ
যুদ্ধবিমানের সংখ্যার দিক থেকেও চিন ভারতের তুলনায় অনেকটা এগিয়ে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা মূল্যায়নে চিনের হাতে ১,৮০০-র বেশি যুদ্ধবিমান থাকার অনুমান করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ফিফট জেনারেশনের স্টেলথ যুদ্ধবিমান জে-২০। শত্রুপক্ষের রাডারে শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমানোর জন্য এই বিমান তৈরি করা হয়েছে। চিনের হাতে ঠিক কতগুলি জে-২০ রয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন অনুমান থাকলেও সঠিক সংখ্যা সামনে আসেনি।
অন্যদিকে, ভারতীয় বায়ুসেনার যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রনের সংখ্যা দীর্ঘদিন ধরেই অনুমোদিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম। বিভিন্ন সাম্প্রতিক মূল্যায়নে ভারতীয় বায়ুসেনার হাতে প্রায় ২৯টি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন থাকার কথা বলা হয়েছে, যেখানে অনুমোদিত সংখ্যা ৪২.৫। সাধারণত একটি স্কোয়াড্রনে প্রায় ১৬ থেকে ১৮টি যুদ্ধবিমান থাকতে পারে। ।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হল যুদ্ধবিমানের সংখ্যা বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং উন্নত অস্ত্রভাণ্ডার তৈরি করা। একই সঙ্গে বিদ্যমান যুদ্ধবিমানগুলির কার্যক্ষমতা বজায় রাখা এবং দ্রুত অভিযান পরিচালনার পরিকাঠামো শক্তিশালী করাও জরুরি।
তাহলে কি আকাশযুদ্ধে চিনের বিরুদ্ধে এগিয়ে থাকবে ভারত?
তিব্বতের উচ্চতা ভারতের জন্য কিছু সম্ভাব্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সমতল এলাকার বিমানঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে অস্ত্র বহন, জ্বালানি এবং উড়ানের প্রস্তুতির দিক থেকে সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
সব মিলিয়ে, তিব্বতের উচ্চতা চিনের বিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে এবং ভারতের সমতল এলাকার বিমানঘাঁটিগুলি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সুবিধা দিতে পারে। তবে সেই সুবিধাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন আধুনিক যুদ্ধবিমান, উন্নত অস্ত্র, শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা এবং দ্রুত অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা।