
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনীতি কোনও স্থিতিশীল ধারণা নয়, রাজনীতি সবসময়ই গতিশীল। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে তৃণমূল কংগ্রেস বিপুলভাবে বিপর্যস্ত করে। বিজেপির কাছে সেটি প্রত্যাশিত ছিল না। ২০২১-য়ের সেই বিজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে গিয়েছিলেন। আর তখন থেকেই তিনি একটা বিরোধী ঐক্যের প্রচেষ্টা শুরু করেছেন। তিনি সবসময় চান নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে বিরোধীরা একাট্টা হয়ে একটা জোট গঠন করুক। কিন্তু ইউপিএ-৩ ও তৈরি হল না। কোনও ফেডারেল ফ্রন্ট-ও আজ পর্যন্ত তৈরি হল না। বরং বিরোধী দলগুলো যে ছত্রভঙ্গ, সেটা আজ আমরা সবাই জানি। সেই কারণে পশ্চিমবঙ্গের জয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জাতীয় রাজনীতির রণকৌশলও সময়ের হাত ধরে বদলেছে।
পশ্চিমবঙ্গের বাইরে ডালপালা বিস্তার করার চেষ্টা তৃণমূল কংগ্রেসের সেদিনও ছিল, এখনো আছে। সেটা কোনও রাজনৈতিক দলেরই থাকা স্বাভাবিক। প্রতিটি আঞ্চলিক দলই স্বপ্ন দেখে যে, সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে কীভাবে তাদের সাংগঠনিক শক্তি সংসদ এবং বিধানসভায় আসন সংখ্যা বাড়াতে পারে। তৃণমূল কংগ্রেস সর্বভারতীয় দল হিসাবে নিজের মর্যাদা রক্ষা করার জন্যেও নির্বাচন কমিশনের নীতি অনুসারে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বিভিন্ন রাজ্যে প্রার্থী দেওয়া প্রয়োজন। আর বিভিন্ন রাজ্যে ভোটে জেতার লক্ষ্যে তাদের অবিচল থাকাটাই স্বাভাবিক। এতদসত্ত্বেও গোয়া নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের সফল না হতে পারাও কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরবর্তী রণকৌশল নির্ধারণে সাহায্য করেছে।
কৌশল বদলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। সত্যি কথা বলতে কী, গোয়াতে যখন নির্বাচন হয় তখন ভৈরব হরষে তৃণমূল কংগ্রেসের গোয়া নির্বাচনে নামার খুব স্বপক্ষে ছিলেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গোয়ার বহু নেতা তখন তৃণমূল কংগ্রেসে আসতে চাইছেন। স্থানীয় দাবি মেনে এই ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ কৌশল নিতে বাধ্য হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটে হেরে যাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অভিমুখ বদলে ফেলেন। সেই আধুনিকতম রণকৌশলের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে এবারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তিনটি বিধানসভা নির্বাচনে।

নাগাল্যান্ড, মিজোরাম এবং ত্রিপুরা— এই তিনটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে। নাগাল্যান্ডে তৃণমূল কংগ্রেস তেমন উৎসাহ দেখায়নি। তার কারণ, নাগাল্যান্ডে তেমন কোনও শরিক দল পায়নি তৃণমূল। তেমন কোনও নেতাকেও তৃণমূল কংগ্রেস পায়নি, যেমনটা পেয়েছে মেঘালয়ে। মেঘালয়ে বিরোধী নেতা হিসেবে মুকুল সাংমা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। তিনি প্রাক্তন লোকসভার স্পিকার। উপজাতি খ্রিস্টান নেতা প্রয়াত পূর্ণ অ্যাজিটক সাংমার পুত্র। সেই মুকুল সাংমা তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন। মেঘালয়ে রটে গেল, কংগ্রেস দল কার্যত নিঃশেষিত হয়ে গেল। কংগ্রেস দল থেকে বহু লোক তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিতে শুরু করে। তখন উৎসাহিত হয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মেঘালয়ে যান। সেখানে গিয়ে তিনি মুকুল সাংমার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটা বোঝাপড়ায় পৌঁছন।
পূর্ণ অ্যাজিটক সাংমার সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক অম্ল-মধুর ছিল। কেননা, তাঁরা দু’জনই সমসাময়িক ছিলেন। আবার এখন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও মুকুল সাংমার সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সম্পর্কটা এখন যথেষ্ট মধুর। তৃণমূল সূত্র বলছে, মেঘালয়ে তৃণমূল কংগ্রেস তেমন উচ্চাকাঙ্ক্ষী নয়। তৃণমূল কংগ্রেসের লক্ষ্য হচ্ছে, কংগ্রেসের যে রাজনৈতিক পরিসর বিনষ্ট হয়েছে, সেই পরিসরে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান এবং প্রধান বিরোধী দল হয়ে ওঠা এবং মুকুল সাংমার হাত ধরে সেখানে তৃণমূল কংগ্রেসকে একটা শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
অনেকে বলছেন, এর ফলে লাভ হয়ে যাবে বিজেপির। ঠিক যেমনটা গুজরাটে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বিরোধিতা এবং রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে এসে পড়ায় বিজেপির ক্ষতির থেকে লাভ বেশি হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের বক্তব্য হচ্ছে, অন্য কোন দলের লাভ বা লোকসানের কথা ভেবে তারা রাজনীতি করছেন না, তারা তাদের দলের শ্রীবৃদ্ধির কথা ভেবেই এই কৌশলটাকে নিয়েছেন। সেই কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ভোট ঘোষণার আগেই সেখানে প্রচার সেরে ফেলেছেন।

এবার ত্রিপুরার কথায় আসা যাক। ত্রিপুরা ছোট রাজ্য। সেখানে মাত্র দু’টি লোকসভা আসন। সেখানেও বিজেপি শাসক দল, কিন্তু বিজেপির বিরুদ্ধেও অ্যান্টি ইনকমবেন্সি শুরু হয়। কংগ্রেস এবং সিপিএম সম্পর্কে একটা বড় অংশের মানুষের মোহভঙ্গ হয়েছে। কেননা, দু’টি দলই ত্রিপুরায় দীর্ঘদিন ধরে রাজত্ব করেছে। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেস সচেষ্ট হয়েছিল যদি সেখানে একটা রাজনৈতিক পরিসরে বৃদ্ধি ঘটানো যায়। বিজেপি এই অসন্তোষের কথাটা বুঝতে পেরে সেখানে মুখ্যমন্ত্রীই বদলে দিলেন। বিপ্লব দেবের বদলে সেখানে এসে গেলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী মানিক দেব। মানিক দেব লো-প্রোফাইল ব্যক্তিত্ব। তিনি দাঁতের ডাক্তার। এর ফলে বিরোধী পক্ষের খুব অসুবিধা হয়। দেখা যায়, তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির মধ্যে প্রবল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে থাকে। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস যেটা আশা করেছিল, সেই রাজনৈতিক পরিসরটা এখনো তৈরি করতে সক্ষম হয়নি।
রাজ্যের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কংগ্রেস নেতা সমীর বর্মণের পুত্র সুদীপ বর্মণের তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেওয়া নিয়ে কথাবার্তা শুরু হয়েছিল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সুদীপ বর্মণের কথাবার্তাও হয়েছিল। শেষপর্যন্ত সেটাও চূড়ান্ত হয়নি। তার কারণ সুদীপ বর্মণ চেয়েছিলেন বিজেপিকে ভেঙে দিয়ে তাড়াহুড়ো করে মহারাষ্ট্রের কায়দায় একটা নতুন সরকার গঠন করতে। তিনি মুখ্যমন্ত্রীও হতে চেয়েছিলেন। এমনটা অভিযোগ করা হয় তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলা হয়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রস্তাবে রাজি হননি। কেননা তাঁর মনে হয়েছিল, তড়িঘড়ি করে যদি এখন সরকার ফেলে দিয়ে নতুন সরকার গঠন করা হয়, তার নেতিবাচক প্রভাব পশ্চিমবঙ্গে পড়বে। বিজেপি তাহলে পশ্চিমবঙ্গে তার বদলা নেবে। তাতে আরও ঝড়-ঝঞ্ঝা শুরু হয়ে যাবে। সেটা খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে। তার ফলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় না বলায় সুদীপ দেব তৃণমূল কংগ্রেসে না এসে বিজেপি ছেড়ে এখন কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। অবশ্য সুদীপ বর্মণ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে যেতে আগ্রহী ছিলেন না। তাঁকে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি যাননি। তিনি কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। এখন সমীর বর্মণ এবং সুদীপ বর্মণ— পিতা-পুত্র দু’জনেই রাস্তায় নেমেছেন বিজেপির বিরুদ্ধে প্রচারে।
সর্বশেষ খবর, কংগ্রেস, সিপিএম এবং সেখানে উপজাতি দল তিপ্রা— তার নেতা আজকের রাজা প্রদ্যোত বর্মণ জোট বাঁধছেন, আসন সমঝোতা করছেন। সেটা বিজেপির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তার কারণ, কংগ্রেস আর সিপিএমের যতটা না সমর্থন আছে, উপজাতিদের মধ্যে বিজেপির বিরোধিতা আছে। উপজাতিরা অসন্তুষ্ট এবং সেই ভোট-ব্যাঙ্কটা কিন্তু প্রদ্যোতের পক্ষে রয়েছে। কেননা, প্রদ্যোতের দলকে বলা হয় রাজার পার্টি। আর রাজা উপজাতি ক্ষত্রিয় পরিবারের সদস্য। সুতরাং, সেই সুযোগটা কংগ্রেস এবং সিপিএম সুকৌশলে নিতে চাইছে। তৃণমূল কংগ্রেস এই জোটে সামিল হচ্ছে না। তারা একলা চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের ত্রিপুরা নিয়ে খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকাশ ঘটাচ্ছে না।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারে যাননি। যদিও ওখানে দু’জন শীর্ষ নেতাকে পর্যবেক্ষক করা হয়েছে। একজন হলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সন্তোষ মোহন দেবের কন্যা সুস্মিতা দেব। সন্তোষ বাবু দীর্ঘদিন ধরে ত্রিপুরার কংগ্রেসের পর্যবেক্ষক ছিলেন। নৃপেন চক্রবর্তীকে সরিয়ে সুধীর মজুমদারকে মুখ্যমন্ত্রী করার যে নির্বাচনী রণকৌশল, সেটা সন্তোষ বাবুই রাজীব গান্ধীর সময় করেছিলেন। তাঁর কন্যা সুস্মিতা দেব অবশ্য ত্রিপুরায় কোনদিন রাজনীতি করেননি। তিনি পর্যবেক্ষক হিসেবে সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত। তাঁর সঙ্গে আছেন রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে গিয়েছিলেন। আবার তিনি তৃণমূলে ফিরে এসেছেন। তিনি এখন সক্রিয়।
এটা খুব পরিষ্কার যে, তৃণমূলের ওখানে খুব বেশি ভাল ফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। যে কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও বারবার বলা সত্ত্বেও তিনি এখনো পর্যন্ত ত্রিপুরাতে ভোট প্রচারে যাননি। হয়তো ভোট প্রচারের সময় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একবার যাবেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য বারবার ত্রিপুরায় গিয়ে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যে তৃণমূল কংগ্রেসকে ওখানে বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সুতরাং, ত্রিপুরার ক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের রণকৌশলটা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী, স্বল্পমেয়াদী নয়।