রাক্ষুসে এল নিনোকে রুখবে দেশি এল নিনোঅস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া দফতরের একটি সাম্প্রতিক বুলেটিনে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ হয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এল নিনোর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। জুনের শুরুতে এল নিনো ৩.৪ সূচক +০.৮১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছছে। যা এল নিনোর সরকারি সাধারণ সীমা +০.৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। এই খবরটি ভারতের কৃষক, সরকার এবং সাধারণ মানুষ, প্রত্যেককেই উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। কারণ এল নিনো প্রায়শই ভারতে দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ুকে দুর্বল করে দেয়।
তবে এই মহাদানবীয় এল নিনোর মাঝেই সুখবর হল, ভারত মহাসাগরে একটি ইতিবাচক ইন্ডিয়ান ওশান ডায়াপোল (IOD) তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে অগাস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে। এটি এল নিনোর কিছু নেতিবাচক প্রভাব প্রশমিত করতে পারে এবং ভারতে ভাল বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
এল নিনো কী? এটি ভারতের বর্ষাকে কীভাবে প্রাভাবিত করে?
এল নিনো হল একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। যা মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। সাধারণত শীতকল জলের ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহের কারে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর শীতল থাকে। কিন্তু যখন এল নিনো ঘটে, তখন বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের ফলে উষ্ণ জল পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং সমগ্র অঞ্চল জুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।
ভারতের জন্য এল নিনোর অর্থ প্রায়শই কম বৃষ্টিপাত। এর কারণ হল, এল নিনোর ঊর্ধ্ব বায়ু ভারতের দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু এল নিনোর সময়ে ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের উপর বায়ুমণ্ডলীয় নিম্নগামী প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। যা মেঘ গঠন এবং বৃষ্টিপাতকে বাধা দেয়। এর ফলে খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ফসলের ক্ষতি এবং জলের অভাব দেখা যায়।
ভারতের মৌসম ভবন এ বছরের বর্ষার জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে। কিন্তু আবহাওয়াবিজ্ঞানে একটি ইতিবাচক IOD ভারতের জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারে।
ইন্ডিয়ান ওশান ডায়াপোল (IOD) কী?
ইন্ডিয়ান ওশাব ডায়াপোল ভারতের মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ুগত ঘটনা। একে কখনও কখনও ভারতীয় এল নিনো বলা হয়। আফ্রিকার নিকটবর্তী সোমালিয়া উপকূসের পশ্চিমাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার উপকূলের পূর্বাংশের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পার্থক্যের উপর ভিত্তি করে এটি ঘটে থাকে।
IOD-র ৩টি পর্যায় রয়েছে
পজিটিভ IOD: ভারত মহাসাগরের পশ্চিম অংশের (আফ্রিকার দিকে) জল স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, পূর্ব অংশ (ইন্দোনেশিয়ার দিকে) শীতল থাকে। এর ফলে পশ্চিম দিকে আর্দ্রতার প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
নেগেটিভি IOD: ঠিক উল্টো। পূর্ব অংশ উষ্ণ এবং পশ্চিম অংশ শীতল।
নিরপক্ষে IOD: উভয় দিকেই তাপমাত্রা প্রায় স্বাভাবিক।
পশ্চিম ও পূর্বের তাপমাত্রার পার্থক্যের উপর ভিত্তি করে IOD সূচক ব্যবহার করে IOD গণনা করা হয়। জুনে এই সূচক ছিল -০.৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়া, যা নিরপেক্ষ সীমার মধ্যে। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং অন্যান্য মডেল থেকে জানা যাচ্ছে অগাস্ট ও সেপ্টেম্বরে একটি পজিটিভ IOD তৈরি হতে পারে।
পজিটিভ IOD বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনে পরিবর্তন আনে। পশ্চিমে ভারত ও আফ্রিকায় আর্দ্রতা ও বৃষ্টি বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, পূর্বাঞ্চলে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় খরা দেখা দিতে পারে।
পজিটিভ IOD কীভাবে এল নিনোকে ভারসাম্য দেবে?
এল নিনো এবং IOD উভয়ই সামুদ্রিক ঘটনা। কিন্তু এদের প্রভাব প্রায়শই বিপরীতধর্মী হয়। এল নিনো ভারতে বৃষ্টিপাত কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে, একটি ইতিবাচক IOD বৃষ্টিপাত বাড়াতে সাহায্য করে।
বৈজ্ঞানিক কারণ: একটি ইতিবাচক IOD ভারত মহাসাগরের উপর একটি নিম্নচাপ অঞ্চল তৈরি করে। যা মৌসুমী বায়ুকে আকর্ষণ করে। এর ফলে বঙ্গোপসাগর এবং আরব সাগর থেকে আর্দ্র বায়ু পৌঁছতে পারে। এল নিনোর প্রভাব প্রধানত জুন এবং জুলাই মাসে অনুভূত হয়। অন্যদিকে, পরিস্থিতির ভারসাম্য রাখার জন্য অগাস্ট-সেপ্টেম্বরে IOD সক্রিয় হতে পারে।