শীত পড়বেই না এবার? ভারতে বর্ষা শেষ হলেও এল নিনোর প্রভাব এখনও কাটেনি। আর তা থেকেই উঠছে নতুন প্রশ্ন। স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের পর এবার ভারতের শীতের আবহাওয়ায় কী প্রভাব ফেলতে পারে শক্তিশালী এল নিনো?
চলতি বছর স্বাভাবিকের তুলনায় ১৩ শতাংশ কম বৃষ্টিপাতের ঘাটতি নিয়েই বিদায় নিয়েছে বর্ষা। এরই মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত শক্তিশালী হয়েছে এল নিনো। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শীতকালেও আবহাওয়ার উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বজায় রাখতে পারে এই জলবায়ুগত পরিস্থিতি। IMD জানিয়েছে, চলতি বছরের শেষের দিকে এল নিনো ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।
তবে বর্ষায় বৃষ্টির ঘাটতি থাকলেই যে শীত শুষ্ক বা অত্যধিক উষ্ণ হবে, এমনটা নয়। ভারতের শীতের উপর এল নিনোর প্রভাব বেশ জটিল।
এ বার কি স্বাভাবিকের তুলনায় উষ্ণ হবে শীত?
শক্তিশালী এল নিনোর সময় ভারতের একাধিক অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় উষ্ণ হবে শীত। এর অন্যতম কারণ, এল নিনো ক্রান্তীয় অঞ্চলে বায়ুর ঊর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী প্রবাহ। ভারতের শীতকালীন আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থাগুলিও এর দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।
এর উদাহরণ ২০১৫-১৬ সালের শীতকাল। সে বছর শক্তিশালী এল নিনো এবং ২০১৫ সালের ঘাটতিপূর্ণ বর্ষার পর ভারতে অস্বাভাবিক উষ্ণ শীত দেখা গিয়েছিল। ডিসেম্বর ও জানুয়ারির কয়েকটি সময়ে দেশের বহু অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক ডিগ্রি বেশি ছিল। পাশাপাশি শীতকালীন বৃষ্টিপাতও ছিল অত্যন্ত কম। বিজ্ঞানীরা এই উষ্ণতার পিছনে এল নিনোর পাশাপাশি আঞ্চলিক বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনের পরিবর্তনকেও দায়ী করেছিলেন।
কৃষির ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শীতকাল শুধু ঠান্ডার মরশুম নয়, এই সময়েই গম-সহ বিভিন্ন রবি শস্যের চাষ হয়।
এল নিনো মানেই কি শীতকালে কম বৃষ্টি?
এখানেই রয়েছে আবহাওয়ার হিসাবের জটিলতা। এল নিনো থাকলেই যে শীতকালে বৃষ্টিপাত কমবে, এমন কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। উত্তর-পশ্চিম ভারতে শীতকালীন বৃষ্টির একটি বড় অংশ আসে ‘ওয়েস্টার্ন ডিস্টার্ব্যান্স’ বা পশ্চিমী ঝঞ্ঝার মাধ্যমে। ভূমধ্যসাগর ও তার আশপাশের অঞ্চল থেকে পূর্ব দিকে এগিয়ে আসা এই আবহাওয়া ব্যবস্থা উত্তর ভারতের সমতলে বৃষ্টি এবং হিমালয় অঞ্চলে তুষারপাত ঘটায়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এল নিনোর সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম ভারতে শীতকালীন বৃষ্টিপাত বৃদ্ধিরও সম্পর্ক থাকতে পারে। কারণ, এল নিনো বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনে এমন পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যা পশ্চিমী ঝঞ্ঝার শক্তি বা গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করে।
অর্থাৎ, একই সময়ে দেশের কোনও কোনও অঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে, আবার উত্তর-পশ্চিম ভারতে শীতকালীন বৃষ্টিপাতও বাড়তে পারে।
অতীতের অভিজ্ঞতা কী বলছে?
শক্তিশালী এল নিনোর অতীতের ঘটনাগুলি দেখলে বোঝা যায়, এর প্রভাব সম্পর্কে কোনও সূত্র নেই। ১৯৮২ এবং ১৯৮৭ সালে শক্তিশালী এল নিনোর সঙ্গে ভারতে বর্ষার ব্যাপক ঘাটতি দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৭ সালে অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো থাকা সত্ত্বেও দেশের সামগ্রিক বর্ষার বৃষ্টিপাত প্রায় স্বাভাবিক ছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, ভারত মহাসাগরের উপর বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনের পরিবর্তন ওই বছর ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।
শীতকালেও একই ধরনের তারতম্য দেখা যায়। ২০১৫-১৬ সালের শীত দেখিয়েছিল, এল নিনো কীভাবে অস্বাভাবিক উষ্ণতা এবং শীতে স্বাভাবিক ঠান্ডার ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তবে অন্য বছরগুলিতে আঞ্চলিক বৃষ্টিপাত, পশ্চিমী ঝঞ্ঝা এবং ভারত মহাসাগরের পরিস্থিতি শীতের আবহাওয়া অন্যরকম ছিল।
২০২৬-২৭ সালের শীত কেমন হতে পারে?
চলতি বছরে উদ্বেগের কারণ, এল নিনো এখনও শক্তিশালী হচ্ছে। ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বছরের শেষে এর শক্তি আরও বাড়তে পারে। বিভিন্ন পূর্বাভাসে ২০২৭ সালের গোড়া পর্যন্ত এল নিনোর প্রভাব বজায় থাকার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের একাধিক অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় উষ্ণ শীত, শীতকালীন বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এবং আবহাওয়ার ওঠানামা বাড়তে পারে। তবে দেশের প্রতিটি অঞ্চল যে উষ্ণ বা শুষ্ক হয়ে উঠবে, এমনটা বলা যায় না।
কারণ, ভারতের শীতকাল শুধু এল নিনোর উপর নির্ভর করে না। আরও একাধিক বায়ুমণ্ডলীয় ও মহাসাগরীয় পরিস্থিতি এর উপর প্রভাব ফেলে।
কৃষকদের জন্য তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু এই নয়, এল নিনোর কারণে শীত উষ্ণ হবে কি না। বরং শস্যের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত ঠান্ডা, বৃষ্টি এবং তুষারপাত হবে কি না, সেটাই বড় বিষয়। বিশেষ করে এবারের বর্ষায় দেশের একাধিক অঞ্চলে জলের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় রবি শস্যের চাষ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো এবারের শীতের পরিস্থিতি তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত ভারতের আবহাওয়া কোন দিকে যাবে, তা নির্ধারণ করবে দেশের নিজস্ব বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতির উপরও।