জ্ঞানেশ কুমার রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে নয়, ২০০৬ সালের একটি নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ভিজিল্যান্স তদন্ত হচ্ছে। মঙ্গলবার এমনটাই জানিয়েছেন কেরলমের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ চেন্নিথালা। তাঁর বক্তব্য, অভিযোগটি নিজস্ব গুরুত্বের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা উচিত এবং প্রমাণ ও তথ্যের ভিত্তিতেই তদন্ত এগোবে। জ্ঞানেশ কুমার যখন কেরলমের PWD সচিব ছিলেন, সেই সময়ের একটি রাস্তা প্রকল্পকে ঘিরেই এই অভিযোগ।
ঘটনার সূত্রপাত প্রায় ২০ বছর আগে, ২০০৬ সালে। কেরলম স্টেট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট বা KSTP-এর অধীনে বিশ্বব্যাঙ্কের অর্থসাহায্যে প্রায় ২১৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। অঙ্গমালি থেকে তিরুঅনন্তপুরম পর্যন্ত এম সি রোড পুনর্নির্মাণের কাজ ছিল এই প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্পের কাজ করছিল মালয়েশিয়ার একটি সংস্থা এবং ভাগীরথ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যৌথ উদ্যোগ PATI-BEL।
এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মালয়েশীয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং PATI-BEL-এর চিফ প্রজেক্ট ম্যানেজার লি সি বীন। ২০০৬ সালে তিনি আত্মহত্যা করেন। তাঁর রেখে যাওয়া সুইসাইড নোটে তৎকালীন কেরল PWD সচিব জ্ঞানেশ কুমারের নাম ছিল বলে দাবি করেছেন রমেশ চেন্নিথালা। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই নোটে প্রকল্পের কাজ সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগের কথাও ছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি আধিকারিকদের তরফে হয়রানি, প্রকল্পের কাজের বিল মেটাতে দেরি এবং দুর্নীতির মতো বিষয় নিয়ে লি সি বীন অভিযোগ করেছিলেন। আরও অভিযোগ রয়েছে, কাজের বিল মেটানোর ক্ষেত্রে ঘুষ চাওয়ার কথাও তাঁর নোটে উল্লেখ ছিল। তবে এগুলি সবই অভিযোগ, যার সত্যতা এখনও তদন্তসাপেক্ষ।
বীনের মৃত্যুর পরই জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ভিজিল্যান্স তদন্ত শুরু হয়েছিল। সেই সময় তাঁকে কেরলের PWD সচিবের পদ থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয় এবং পরে কেন্দ্রীয় ডেপুটেশনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকে পাঠানো হয়। তবে আগের ভিজিল্যান্স তদন্ত শেষ পর্যন্ত আর এগোয়নি বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এবার সেই পুরনো বিষয়ই নতুন করে সামনে এসেছে।
এবার কেরলম কংগ্রেস নেতা মালয়িনকিঝু ভেনুগোপাল নতুন করে অভিযোগ জমা দেওয়ার পর বিষয়টি ফের খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, আগের তদন্তে বাইরের প্রভাব কাজ করেছিল এবং তদন্ত যথাযথভাবে এগোয়নি। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে কেরলমের ভিজিল্যান্স অ্যান্ড অ্যান্টি কোরাপশন ব্যুরোকে প্রাথমিক তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুরনো তদন্তের নথিও চেয়ে পাঠিয়েছে রাজ্য সরকার।
প্রসঙ্গত, ২১৫ কোটি টাকা ছিল পুরো KSTP প্রকল্পের মূল্য। বর্তমানে যে তদন্ত হচ্ছে, সেখানে প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, বীনের মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগ এবং আগের তদন্ত কেন এগোয়নি, সেই বিষয়গুলিও খতিয়ে দেখা হবে।
রমেশ চেন্নিথালা অবশ্য স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই তদন্ত রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে নয়। তাঁর বক্তব্য, ২০০৬ সালের KSTP প্রকল্প নিয়ে একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ সরকারের কাছে এসেছে। তাই সেটি নিজের গুরুত্বের ভিত্তিতে পরীক্ষা করা হবে। ভিজিল্যান্সকে প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করে তথ্য সামনে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। বিজেপি দাবি করেছে, ওই সময় কেরলের PWD মন্ত্রী ছিলেন ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগের নেতা এম কে মুনীর। তাই তাঁকেও তদন্তের আওতায় আনা উচিত। বিজেপির অভিযোগ, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে নিশানা করতেই আইনকে বেছে বেছে ব্যবহার করা হচ্ছে। একইসঙ্গে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের বিরুদ্ধে কেন কোনও পদক্ষেপ করা হচ্ছে না, সেই প্রশ্নও তুলেছে দলটি।
অর্থাৎ, ২০০৬ সালের একটি ২১৫ কোটি টাকার রাস্তা প্রকল্প, মালয়েশীয় ইঞ্জিনিয়র লি সি বীনের আত্মহত্যা, তাঁর সুইসাইড নোটে জ্ঞানেশ কুমারের নাম থাকার দাবি এবং পুরনো ভিজিল্যান্স তদন্তের অগ্রগতি না হওয়ার অভিযোগ, সব মিলিয়েই ফের তদন্তের মুখে বিষয়টি। আপাতত এটি প্রাথমিক তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে।