
তামিলনাড়ুর সাথানকুলাম হেফাজতে নির্যাতন মামলায় পাঁচ বছর পর দোষীদের সাজা দিলে আদালত। বাবা পি. জয়রাজ ও ছেলে জে. বেনিক্সের মৃত্যুর ঘটনায় রাজ্যের ৯ জন পুলিশকর্মীকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই রায়ের নেপথ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এক জুনিয়র পুলিশকর্মী। হেড কনস্টেবল রেবতী। তাঁর সাহসী সাক্ষ্য না থাকলে হয়তো এই মামলা কখনওই এমন পরিণতিতে পৌঁছত না।
২০২০ সালে কোভিড বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে একটি মোবাইলের দোকান খোলা রাখার দায়ে জয়রাজ ও তাঁর ছেলেকে আটক করা হয়। অভিযোগ, থানায় নিয়ে গিয়ে তাঁদের ওপর নৃশংস অত্যাচার চালানো হয়। কয়েকদিনের মধ্যেই দু’জনের মৃত্যু হয়, যা গোটা দেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।
সেই সময় সাথানকুলাম থানায় কর্মরত ছিলেন রেবতী। নিজের নিরাপত্তা, পরিবার কিংবা চাকরি, কোনও কিছুর নিশ্চয়তা না থাকা সত্ত্বেও তিনি রাজসাক্ষী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি থানার ভেতরে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিটি খুঁটিনাটি তুলে ধরেন।
তিনি ম্যাজিস্ট্রেটকে জানিয়েছিলেন, কীভাবে আটক দুই ব্যক্তিকে নির্মমভাবে মারধর করা হচ্ছিল, তাঁদের শরীরে একের পর এক আঘাত করা হচ্ছিল, এমনকি তাঁদের গোপনাঙ্গেও নির্যাতন চালানো হয়। রেবতীর কথায়, 'পুলিশকর্মীরা হাতের কাছে যা পেয়েছে, তা দিয়েই আঘাত করেছে। মাঝে শুধু মদ্যপানের জন্য বিরতি নিয়েছিল।'
তিনি আরও জানান, থানায় পৌঁছে তিনি চিৎকার আর আর্তনাদ শুনেছিলেন। আহত অবস্থায় জয়রাজকে তিনি জল ও কফি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাও কেড়ে নেওয়া হয়। একসময় পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, তিনি আর সেই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান।
রেবতী সিসিটিভি ফুটেজে দেখা ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করেন, যা অভিযুক্তদের উপস্থিতি প্রমাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। সহকর্মীদের চাপ ও হুমকি সত্ত্বেও তিনি নিজের বক্তব্যে অনড় থাকেন। যা পুলিশ বাহিনীর মতো কাঠামোয় অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করার সময় পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে, ম্যাজিস্ট্রেটকে নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়। থানার বাইরে অন্য পুলিশকর্মীরা জড়ো হয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করছিল। এমনকি শুরুতে রেবতী নিজের জবানবন্দিতে সই করতেও ভয় পাচ্ছিলেন। পরে নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে তিনি সই করেন।
পরবর্তীতে মাদ্রাজ হাইকোর্টের নির্দেশে তাঁর এবং তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। তবুও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তাদের তরফে হয়রানির শিকার হতে পারেন।
সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও রেবতীর এই সাহসী পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাঁর সাক্ষ্যই এই মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।