হিমাচলে তুষারপাতHimachal Pradesh Snowfall: রূপকথার সাদা চাদর নয়, বরং প্রকৃতির রুদ্ররূপ দেখল হিমাচল। বসন্তের আগমনে যখন সমতলে রোদের তেজ বাড়ছে, ঠিক তখনই হিমাচল প্রদেশের মানালি ও সংলগ্ন উচ্চ পার্বত্য এলাকায় আছড়ে পড়ল প্রবল তুষারঝড়। রবিবার আচমকা ভারী তুষারপাতের জেরে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে বিশ্ববিখ্যাত অটল টানেলের দক্ষিণ পোর্টাল। পুরু বরফের স্তরে আটকে পড়েছে পর্যটকদের কয়েকশো গাড়ি। হাড়কাঁপানো কনকনে ঠান্ডা আর ঝাপসা দৃষ্টিসীমার মধ্যে আটকে পড়া মানুষগুলোকে উদ্ধারে এবার কার্যত যুদ্ধের ময়দানে নামতে হয়েছে কুলু জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় পুলিশকে।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাসকে সত্যি করে শনিবার রাত থেকেই পাহাড়ে আবহাওয়ার মেজাজ বদলাতে শুরু করেছিল। রবিবার সকাল হতেই মানালি, লাহুল এবং স্পিতি উপত্যকায় শুরু হয় তুষারপাত। অটল টানেলের দক্ষিণ পোর্টালে বরফের পুরু স্তর এতটাই জমে যায় যে, পর্যটকদের গাড়িগুলো চাকা ঘোরানোর ক্ষমতা হারায়। ফলে হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যে মাঝরাস্তায় আটকে পড়েন কয়েকশো ভ্রমণপিপাসু মানুষ। তাঁদের মধ্যে শিশু এবং বয়স্কদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে।
বিপর্যয়ের খবর পেতেই দ্রুত সক্রিয় হয় হিমাচল পুলিশ। কুলু ও মানালি থেকে উদ্ধারকারী দল ভারী ক্রেন এবং স্নো-কাটার নিয়ে অটল টানেলের অভিমুখে রওনা দেয়। শুরু হয় ‘অপারেশন রেসকিউ’। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আবহাওয়া এতটাই প্রতিকূল যে উদ্ধারের কাজে বারবার বিঘ্ন ঘটছে। বরফ কেটে রাস্তা পরিষ্কার করার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই নতুন করে তুষারপাত সব ঢেকে দিচ্ছে। তবে পর্যটকদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে আনার কাজে কোনো খামতি রাখছে না প্রশাসন।
আটকে পড়া পর্যটকদের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে গরম জল, শুকনো খাবার ও কম্বলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। লাহুল-স্পিতি ও কুলু পুলিশের কর্মীরা নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বরফের ওপর দিয়ে গাড়িগুলোকে ঠেলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। মানালির মহকুমা শাসক জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কয়েকশো গাড়িকে সুরক্ষিত জায়গায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনও অনেক পর্যটক টানেল সংলগ্ন দুর্গম এলাকায় আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রকৃতির এই রুদ্ররোষের জেরে হিমাচলের জনজীবন কার্যত স্তব্ধ। তুষারপাতের সঙ্গে সঙ্গে উপত্যকায় নেমেছে ধস, যার ফলে মানালি-লেহ জাতীয় সড়ক সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। লাহুল এবং স্পিতির প্রশাসন সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের অতি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দিয়েছে। ধসপ্রবণ এলাকাগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে বিশেষ নজরদারি দল।
আবহাওয়াবিদদের মতে, পাহাড়ে নিম্নচাপের প্রভাবে আগামী ৪৮ ঘণ্টা আবহাওয়া এমনই খামখেয়ালি থাকবে। আরও তুষারপাতের সম্ভাবনা থাকায় পর্যটকদের আপাতত অটল টানেলের দিকে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। যারা মানালি বা সংলগ্ন এলাকায় ভ্রমণের পরিকল্পনা করছিলেন, তাঁদের আপাতত সফর স্থগিত রাখার আবেদন জানিয়েছেন পুলিশ সুপার। এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার স্বার্থে মানালি থেকে লাহুল যাওয়ার সব বাস পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া এক পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, “পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অক্সিজেন কম থাকা এবং হিমাঙ্ক নিচে তাপমাত্রা থাকায় উদ্ধারকারী দলের কর্মীরাও ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। কিন্তু যতদিন না শেষ পর্যটককে সুরক্ষিতভাবে নিচে নামিয়ে আনা হচ্ছে, ততদিন এই লড়াই চলবে।” স্থানীয় মানুষজনও প্রশাসনের হাতে হাত মিলিয়ে উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করছেন। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে যাতে কোনো রকম বিশৃঙ্খলা না হয়।
পরিশেষে, তুষার-শুভ্র পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যে এমন চরম সঙ্কটে পড়তে হবে, তা ভাবেননি কেউ। প্রকৃতির এই খামখেয়ালি রূপ যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, পাহাড়ের হাতছানি যেমন মায়াবী, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিপদও ঠিক ততটাই ভয়াবহ। উদ্ধারকাজ শেষ হলে হিমাচল প্রশাসনকে পাহাড়ের সুরক্ষা বিধি নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা করতে হবে। আপাতত দিল্লির পর্যটন দপ্তরের নজর এখন অটল টানেলের সেই সাদা বরফের স্তূপের দিকে, যেখানে জীবনের লড়াই লড়ছেন কয়েকশো মানুষ।