১১৪টি যুদ্ধবিমান কিনতে ফ্রান্সকে লেটার অব রিকোয়েস্ট পাঠাচ্ছে ভারত, সাড়ে ৩ লাখ কোটির মেগা ডিলIndia-France Rafale Deal: দেশের আকাশসীমাকে নিচ্ছিদ্র করতে এবং চীন ও পাকিস্তানের যৌথ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিতে চলেছে মোদী সরকার। ভারতীয় বিমানবাহিনীর (IAF) শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে ১১৪টি অত্যাধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার জেট বা যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়াকে একধাক্কায় অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে খবর, ফ্রান্স সরকারের কাছে পাঠানোর জন্য চূড়ান্ত করে ফেলা হয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘লেটার অফ রিকোয়েস্ট’ (LoR)। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো বড় ধরনের সরকারি স্তরের বা জিটুজি (G2G) প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রে এই নথিকেই আনুষ্ঠানিক সূচনা বলে গণ্য করা হয়। আসলে ভারতীয় বিমানবাহিনীর জন্য মোট ১১৪টি রাফাল বিমান কেনার এই মেগা পরিকল্পনা মূলত 'এমআরএফএ' (MRFA) বা মাল্টি-রোল ফাইটার এয়ারক্রাফট কর্মসূচিরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আকাশছোঁয়া বাজেট এবং 'মেক ইন ইন্ডিয়া'র মহাপরিকল্পনা
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঐতিহাসিক মেগা চুক্তির আনুমানিক আর্থিক মূল্য হতে চলেছে প্রায় ৩.২৫ লাখ কোটি টাকা, যা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটার তালিকাভুক্ত। তবে এই চুক্তির সবচেয়ে বড় এবং আকর্ষণীয় টুইস্ট হলো কেন্দ্রের 'মেক ইন ইন্ডিয়া' (Make in India) বা দেশীয়করণের ওপর দেওয়া বিপুল জোর। চুক্তি অনুযায়ী, ১১৪টির মধ্যে মাত্র ১৮ থেকে ২২টি যুদ্ধবিমান সরাসরি ফ্রান্স থেকে তৈরি অবস্থায় (Fly-away condition) ভারতে আসবে। আর বাকি প্রায় ৯০ থেকে ৯৬টি রাফাল বিমান ভারতের মাটিতেই তৈরি অথবা অ্যাসেম্বল করা হবে। এর জন্য ফরাসি যুদ্ধবিমান নির্মাতা সংস্থা 'ডাসো অ্যাভিয়েশন' (Dassault Aviation) ভারতের যেকোনো একটি সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে হাত মিলিয়ে এই দেশীয় উৎপাদন প্রক্রিয়া চালাবে। যদিও সহযোগী ভারতীয় সংস্থা হিসেবে কার নাম চূড়ান্ত হচ্ছে, তা এখনও সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়নি। এমনকি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেডও (HAL) জানিয়েছে, এই প্রকল্পের বিষয়ে তাদের কাছে এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বা অফিশিয়াল নোটিফিকেশন আসেনি।
কেন এই যুদ্ধবিমানের এত জরুরি প্রয়োজন ভারতের?
আসলে ভারতীয় বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানের স্কোয়াড্রন সংখ্যা প্রতিনিয়ত কমছে। পুরনো মিগ (MiG) এবং অন্যান্য যুদ্ধবিমানগুলি একে একে অবসর নেওয়ার কারণে আকাশে ভারতের শক্তি বাড়াতে নতুন ফাইটার জেটের প্রয়োজন এখন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। আর এটাই এই মেগা ডিলের প্রধান কারণ। তাছাড়া, ভারতীয় বায়ুসেনায় আগে থেকেই ৩৬টি রাফাল বিমান সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে। ফলে নতুন বিমানগুলি এলে আগের পরিকাঠামো ও ট্রেনিং সিস্টেমকেই পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে। এবারের ডিলের আরও একটি বড় শর্ত হলো প্রযুক্তি হস্তান্তর (ToT) এবং ভারতীয় প্রযুক্তির মেলবন্ধন। ভারত চায় এই নতুন রাফাল বিমানগুলিতে যেন সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি 'অস্ত্র' (Astra) মিসাইল এবং 'ব্রহ্মস-এনজি' (BrahMos-NG)-র মতো মারাত্মক অস্ত্র অনায়াসে ব্যবহার করা যায়। বিমানে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দেশীয় সামগ্রী ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। তবে এর মাঝেই একটি স্পর্শকাতর বিষয় উঠে এসেছে— ফ্রান্স এখনও রাফাল বিমানের সম্পূর্ণ 'সোর্স কোড' (Source Code) ভারতের সঙ্গে শেয়ার করতে পুরোপুরি রাজি হয়নি, যা নিয়ে দুই দেশের টেবিলে এখনও টানাপোড়েন চলছে।
মোদী ও এয়ার চিফের ফ্রান্স সফর এবং অন্তিম সিলমোহর
এই মেগা ডিলকে দ্রুত বাস্তবায়িত করতে ইতিমধ্যেই ফ্রান্স পৌঁছে গিয়েছেন ভারতের এয়ার চিফ মার্শাল অমর প্রীত সিং। মনে করা হচ্ছে, তাঁর এই সফরেই রাফাল চুক্তির উচ্চপর্যায়ের জটগুলি কেটে যাবে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীরও একটি ফ্রান্স সফর প্রস্তাবিত রয়েছে, যা এই চুক্তিকে এক চূড়ান্ত রাজনৈতিক ও কৌশলগত গতি দেবে। উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল (DAC) আগেই এই প্রস্তাবে সবুজ সংকেত দিয়ে রেখেছিল। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ১১৪টি বিমানের মধ্যে ৮৮টি সিঙ্গেল-সিটার এবং ২৬টি টুইন-সিটার কনফিগারেশন থাকতে পারে। চলতি ২০২৬ সালের শেষভাগের মধ্যেই সমস্ত আলাপ-আলোচনা শেষ করে মূল চুক্তিতে সই করার লক্ষ্য নিয়েছে সাউথ ব্লক। তবে চূড়ান্ত সায় মিলবে ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি (CCS)-র কাছ থেকে। এর বাইরেও ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য আরও ২৬টি 'রাফাল মেরিন' (Rafale Marine) বিমান কেনার আলাদা একটি চুক্তিও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
সব মিলিয়ে নির্যাস এটাই যে, ভারত এখন আর শুধু বিদেশ থেকে অস্ত্র কিনে ক্ষান্ত থাকতে রাজি নয়, বরং তা দেশের মাটিতেই তৈরি করার রণকৌশলে এগোচ্ছে। ১১৪টি রাফালের এই মেগা ডিল একদিকে যেমন দেশের বিমানবাহিনীর ডানা আরও শক্ত করবে, তেমনই চাঙ্গা করবে ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা শিল্পকেও।