গাছের অভাবেই কি দেশজুড়ে তাপপ্রবাহ, বাড়ছে গরম?চলতি বছরের এপ্রিল মাসের শেষের দিকে দেশের একাধিক অঞ্চলে তাপপ্রবাহের ক্ষেত্রে আগের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে গিয়েছে। এ বছরে তাপের তীব্রতা নিয়ে আলোচনা চলছে। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠছে কেন এমন তাপপ্রবাহ চলছে? গরম কি এবার অনেক আগেই এসে গেল? অনেকেই এর জন্য গাছের অভাব এবং বন ছেদনকেই দায়ী করছেন।
গাছের অভাবে বাড়ছে তাপমাত্রা?
সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ভাইরাল হচ্ছে একাধিক পোস্ট। যেখানে বলা হচ্ছে, ভারতে মাথাপিছু মাত্র ২৮টি গাছ রয়েছে , যেখানে বিশ্বব্যাপী এই গড় সংখ্যা ৪২২। তাহলে, এ বছরের আকস্মিক তাপপ্রবাহের আসল কারণ কি সত্যিই গাছের এই অভাব?
একাধিক শহরে তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে
এই বছর দেশের মধ্য ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শহরগুলিতে এপ্রিলের শেষভাগ থেকেই তীব্র গরম পড়েছে। দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্যে তাপমাত্রা ৪২ থেকে ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। IMD বেশ কয়েক দিনের জন্য তাপপ্রবাহের অ্যালার্টও জারি করেছে।
কী দাবি করা হচ্ছে?
নেটিজেনরা দাবি করছেন, এবার গরম আগের বছরগুলির চেয়ে অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে। দিনের বেলার প্রখর রোদ তো থাকছেই, এমনকি গরমের জেরে রাতেও কোনও স্বস্তি পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, শহরাঞ্চলে কংক্রিট এবং গাছপালা কমে যাওয়ায় স্থানীয় তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হচ্ছে। কিন্তু এই সমস্যার একমাত্র কারণ কি গাছের অভাব?
গাছের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক
সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করা হচ্ছে, ভারতে মাথাপিছু মাত্র ২৮টি গাছ রয়েছে। যেখানে বৈশ্বিক গড় হল ৪২২টি। এই পরিসংখ্যানটি আদতে পুরোনো, কিন্তু মানুষ এখন এটি নিয়ে বারবার আলোচনা করছে। সমালোচকদের দাবি, বন উজাড় এবং নগরায়নের ফলে গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তাপপ্রবাহ বাড়ছে।
তাঁদের দাবি, গাছপালা কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিক তাপ শোষণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে তাপের তীব্রতা বেড়েছে। কিন্তু এটা কি সত্যি? আসুন সরকারি ও আন্তর্জাতিক তথ্যও খতিয়ে দেখি।
বনভূমি বৃদ্ধির পরিসংখ্যান কী বলছে?
গ্লোবাল ফরেস্ট রিসোর্সেস অ্যাসেসমেন্ট -এর ২০২৫ রিপোর্ট অনুসারে বিশ্বে বনভূমি বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে ভারত তৃতীয় স্থানে রয়েছে। অন্যদিকে মোট বনভূমির দিক থেকে ভারত বিশ্বে নবম স্থানে রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে বন ও বৃক্ষসৃজন বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, মোট জমির প্রায় ২৫.১৭ শতাংশ বন ও গাছ দিয়ে ঢাকা রয়েছে। বিগত কয়েক বছরে বনভূমি বৃদ্ধিতে ভারত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। যদিও আগে ঘন থাকা কিছু বন এখন কম ঘন হয়েছে। তবে সার্বিকভাবে দেশে বনভূমির বৃদ্ধি পজিটিভ রয়েছে।
তাপপ্রবাহের জেরে ভারতে আসলে কম ক্ষতি হয়েছে?
বিগত কয়েক দশকে বিশ্বের প্রতিটি দেশের গড় তাপমাত্রা প্রতি দশকে ১ থেকে ১.৫ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, ভারতে এই বৃদ্ধি হয়েছে প্রতি দশকে মাত্র ০.৫ থেকে ১ ডিগ্রি। এর অর্থ হল, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় ভারতে উষ্ণতা কম বেড়েছে। ফলে এটি একটি বৈজ্ঞানিক সত্য, যা জলবায়ু বিজ্ঞানীরাও স্বীকার করেন। এছাড়াও গত ১০ থেকে ১৫ বছরে ভারতীয় শহরগুলিতে বড় গাছের সংখ্যা বেড়েছে এবং সরকার বনভূমি রক্ষার্থে সচেষ্ট হয়েছে।
তাহলে তাপ বাড়ছে কেন? তাপপ্রবাহ এমন এগিয়ে আসার কারণ কী?
এ বছরের এপ্রিল মাসের তাপপ্রবাহের তীব্রতার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রাকৃতিক আবহাওয়ার চক্র, শহুরে তাপ এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবেই এসব ঘটছে । পাশাপাশি গাছ কাটাও নিঃসন্দেহে একটি সমস্যা, তবে এটাই একমাত্র সত্যি নয়। বনভূমি বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ভারত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, যদি আমরা আরও বেশি গাছ লাগাই, শহরগুলিতে ছায়া বাড়াই এবং বনের আরও ভালোভাবে যত্ন নিই, তাহলে ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহ মোকাবিলা করা সহজ হতে পারে। বর্তমানে পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে তাপ মোকাবিলার ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে ভালো কাজ করছে। যদিও বনভূমি রক্ষার্থে ও নয়া গাছ লাগাতে আরও জোরদার ভাবে কাজ করতেই হবে।