এল নিনো ২০২৬টানা দু'বছর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে বর্ষায়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ব্যাপক বৃষ্টি, বন্যা, ধস দেখেছে ভারত। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় ফসলও ভাল হয়েছিল। প্রকৃতি যেমন ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল, আবার চাষিদের মুখে হাসিও ফুটিয়েছিল। কিন্তু সেই সুখ ২০২৬ সালে নেই।
২৯ মে অর্থাত্ শুক্রবার IMD নিশ্চিত করে জানিয়ে দিয়েছে, জুন থেকে সেপ্টেম্বর ভারতে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সাধারাণত কমবেশি ৭০ শতাংশ বৃষ্টি হয়। ৯০ শতাংশের কম বৃষ্টি হলেও তা নর্মাল বা স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচানা করেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু ২০১৫ সালে স্বাভাবিকের চেয়েও ৯০ শতাংশ মতো কম বৃষ্টি হয়েছিল। যার জেরে খরা, কম ফল ও জলের সঙ্কটের মুখোমুখি হতে হয়েছিল ভারতের একটি বড় অঞ্চলকে। যদি আবহাওয়ার পূর্বাভাস একদম মিলে যায়, গত ১০ বছরের সবচেয়ে শুকনো বর্ষাকাল পেতে চলেছে ভারত। ২০১৫ সালের পর থেকে এমন শুকনো বর্ষাকাল, কম বৃষ্টিপাত হয়নি বলেই আশঙ্কা।
শুধু এই পরিসংখ্যানই ইঙ্গিত দিচ্ছে, ২০২৬ সালের বর্ষা গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শুষ্ক বর্ষাগুলির একটি হতে পারে। তবে যে তথ্যটি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের, তা হল, সম্পূর্ণভাবে ‘ঘাটতিযুক্ত বর্ষা’-র সম্ভাবনা এখন ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় এতটাই কম হতে পারে যে তা আগেই নির্ধারিত নিম্নসীমারও নীচে নেমে যেতে পারে। সাধারণত কোনও বছরে এত খারাপ বর্ষার সম্ভাবনা থাকে মাত্র ১৬ শতাংশ। কিন্তু ভারতের আবহাওয়া দফতর (IMD) তাদের সর্বশেষ পূর্বাভাসে সেই সম্ভাবনাকে প্রায় চার গুণ বাড়িয়ে ৬০ শতাংশে নিয়ে গিয়েছে। ফলে কৃষি, জলসম্পদ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির উপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। IMD জানাচ্ছে, El Nino (এল নিনো) পুরো শক্তি নিয়ে এখনও পৌঁছয়নি। তাতেই এই পরিস্থিতি।
এল নিনো (El Nino) কী?
এটি একটি উষ্ণ সামুদ্রিক স্রোত, যার প্রভাব পড়ে বিভিন্ন দেশের আবহাওয়ায়। এল নিনোর ঘটনা মূলত ঘটে চিলি, পেরু-সহ দক্ষিণ আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব উপকূলবর্তী দেশগুলিতে। ডিসেম্বরে নাগাদ এক প্রকার দক্ষিণমুখী উষ্ণ স্রোতের সৃষ্টি হয়, মোটামুটি ভাবে ২ থেকে ৭ বছর অন্তর। সেই সময় মহাসাগরের জলস্তরের (সি সারফেস) তাপমাত্রা অন্তত ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যায়। ফলে, উপকূলবর্তী এলাকার বায়ুমণ্ডলও তেতে ওঠে। মহাসাগরের পিঠের জল দ্রুত হারে গরম হয়ে যায়। কারণ, ওই সময় প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্ত থেকে গরম জলের স্রোত ধেয়ে আসে মহাসাগরের পূর্ব দিকে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে, প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তের জলস্তর অনেকটাই গরম। তুলনায় ঠান্ডা চিলি, পেরু সহ দক্ষিণ আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব উপকূলবর্তী জলস্তর।
এখনও সবচেয়ে খারাপ ঘটনা অপেক্ষায়
IMD-র আপডেট অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের পরিস্থিতি এখন স্থির থেকে এল নিনোর দিকে যাচ্ছে। এরপর এল নিনো পরিস্থিতি যখন তৈরি হয়ে যাবে, তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বর্ষার উপরে। এটা পুরোটাই সময়ের বিষয়। শুধু বর্ষাই নয়, এটি একটি ৪ মাসের সিস্টেম, যার চূড়ান্ত মাস হল সেপ্টেম্বর। ওই সময়েই ফসলকে সবচেয়ে বেশি আগলে রাখতে হয়। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে বিপদ। ধান ও অন্যান্য খরিফ ফসলের ক্ষেত্রে শস্যে দানা ভরার পর্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় গাছ জমিয়ে রাখা পুষ্টিকে প্রকৃত শস্যে রূপান্তরিত করে। তাই এই পর্যায়ে পর্যাপ্ত ও ধারাবাহিক বৃষ্টিপাত একেবারেই অপরিহার্য। যদি এল নিনো প্রথমে দুর্বল অবস্থায় শুরু হয়ে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয় এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতে চরম অবস্থায় পৌঁছয়, তাহলে সেটি ভারতীয় কৃষির জন্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিগুলির একটি হতে পারে।
ভারত একাই এই আশঙ্কা প্রকাশ করছে না। অস্ট্রেলিয়ার ব্যুরো অফ মেটিওরোলজি ইতিমধ্যেই পূর্বাভাস দিয়েছে যে জুন মাস থেকেই এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, চিনের ন্যাশনাল ক্লাইমেট সেন্টার জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের জলরাশির উষ্ণায়ন ইতিমধ্যেই এল নিনো পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং আগামী কয়েক মাসে তা আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়েই আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করছেন যে, এল নিনোর প্রভাব কৃষি উৎপাদন, বৃষ্টিপাতের ধরন এবং খাদ্য নিরাপত্তার উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
সবচেয়ে বেশি কারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে?
IMD-র আঞ্চলিক আঞ্চলিক পূর্বাভাসও খুব একটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে না। শুধুমাত্র উত্তর-পূর্ব ভারতেই স্বাভাবিকের কাছাকাছি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি গড় বৃষ্টিপাতের (Long Period Average) ৯৪ থেকে ১০৬ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে। অন্যদিকে, মধ্য ভারত, দক্ষিণ উপদ্বীপীয় ভারত এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের অধিকাংশ এলাকাতেই স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম ভারতে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের মাত্র ৯২ শতাংশ পর্যন্ত নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে IMD-র চিহ্নিত করা 'মনসুন কোর জোন'। গুজরাত থেকে ওড়িশা পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিশাল অঞ্চল দেশের বৃষ্টিনির্ভর কৃষিজমির বড় অংশকে অন্তর্ভুক্ত করে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই গোটা অঞ্চলেই স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে।
আশার আলো কি আছে?
এল নিনো মানে খরা হবেই, এমনটা নয়। ১৯৫১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত যে ১৭টি El Nino হয়েছে,তার মধ্যে ৫টিতে দেখা গিয়েছে, ভারতে বর্ষায় স্বাভাবিক বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতও হয়েছে। বর্ষার বৃষ্টি শুধুমাত্রই এল নিনো পরিস্থিতির উপরে নির্ভর করে না। ফলে এখনই একেবারে হতাশ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। চলতি বছরের জুনের শেষ সপ্তাহে আইএমডি পূর্বাভাস দেবে, জুলাইয়ে কেমন বৃষ্টিপাত হবে।