রাশিয়ার সঙ্গেই থাকবে ভারত, স্পষ্ট জানিয়ে আমেরিকাকে 'একাকী শক্তি' আক্রমণ জয়শঙ্করের

রাশিয়ার তেল কেনা নিয়েও ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন জয়শঙ্কর। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য এবং বিশেষ করে রুশ তেল কেনা নিয়ে আমেরিকা ও ইউরোপের একাংশ সমালোচনা করে আসছে।

Advertisement
রাশিয়ার সঙ্গেই থাকবে ভারত, স্পষ্ট জানিয়ে আমেরিকাকে 'একাকী শক্তি' আক্রমণ জয়শঙ্করের জয়শঙ্কর (ছবি - PTI)
হাইলাইটস
  • এর উদাহরণ দিতে গিয়ে BRICS-এর প্রসঙ্গ টানেন তিনি
  • তিনি সাফ জানান, বিশ্বের দেশগুলি এখন শুধুমাত্র বড় শক্তিগুলির নেতৃত্বের অপেক্ষায় নেই

রাশিয়া নিয়ে পশ্চিমী দেশগুলির সমালোচনার মধ্যেই মস্কোর পাশে থাকার কারণ স্পষ্ট করল ভারত। একই সঙ্গে আমেরিকার সমালোচনাও করলেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি সাফ জানান,ভারতের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা যখনই হুমকির মুখে পড়েছে, তখন রাশিয়া এবং তার আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাই মস্কোর সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ককে শুধু বর্তমান পরিস্থিতি দিয়ে বিচার করা যায় না।

 নয়াদিল্লিতে মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে তিনি আরও দাবি করেন,আমেরিকা নিজের পছন্দেই ধীরে ধীরে একা হয়ে উঠছে। আর এই পরিস্থিতিতে চিনের উত্থান, আমেরিকা-চিনের তীব্র প্রতিযোগিতা এবং মাঝারি ও উদীয়মান শক্তিগুলির আত্মনির্ভরতার চেষ্টা বদলে দিচ্ছে গোটা বিশ্বের কৌশলগত সমীকরণ। 
 
 বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ঐতিহাসিক দিকটি তুলে ধরেন জয়শঙ্কর। তিনি বলেন, দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের অভিজ্ঞতা এখনও বর্তমান সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। তাঁর বক্তব্য, মানুষ ভালো ইতিহাস বা খারাপ ইতিহাস কোনওটাই ভুলে যায় না।

১৯৫০-এর দশক থেকে রাশিয়া এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন বিদেশমন্ত্রী। সেই সময় বিশ্বের একটা বড় অংশ যখন পাকিস্তানের সামরিক শাসনের পাশে ছিল, তখন মস্কোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অন্যরকম ছিল বলে তিনি জানান।

১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। সেই সময় পাকিস্তানের সমর্থনে আমেরিকা বঙ্গোপসাগরে নৌবহর পাঠিয়েছিল। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছিল। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বর্তমান সম্পর্কের পিছনে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে বলেই বার্তা দেন জয়শঙ্কর।

রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে পশ্চিমী দেশগুলির প্রশ্নের জবাবও দেন বিদেশমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, প্রত্যেক দেশ নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বিচার করে। ইউরোপ যেমন রাশিয়াকে নিয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করবে, এমনটা আশা করা যায় না। একইভাবে ভারতের কাছ থেকেও ইউরোপের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করার প্রত্যাশা করা উচিত নয়।

জয়শঙ্করের কথায়, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের অভিজ্ঞতা ‘ইতিবাচক এবং ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক’। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশক থেকে এই সম্পর্ক আরও বদলেছে। সামরিক ও পরমাণু সহযোগিতার পাশাপাশি বাণিজ্য, শক্তি এবং প্রাকৃতিক সম্পদও দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

Advertisement

রাশিয়ার তেল কেনা নিয়েও ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন জয়শঙ্কর। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য এবং বিশেষ করে রুশ তেল কেনা নিয়ে আমেরিকা ও ইউরোপের একাংশ সমালোচনা করে আসছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক সেই সমালোচনাকে অন্যায্য এবং অযৌক্তিক বলে জানিয়েছে। ভারতের বক্তব্য, বিশ্ববাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একটা সময়ে আমেরিকাই ভারতকে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার বিষয়ে উৎসাহিত করেছিল।

রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শক্তি সহযোগিতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে সংসদীয় পরামর্শদাতা কমিটিকেও ব্রিফ করেন জয়শঙ্কর। সেখানে তিনি জানান, ভারতের অগ্রাধিকার হল দেশের গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখার নীতিতেই এগোতে চায়।

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও ভারতের অবস্থান ফের স্পষ্ট করেছেন বিদেশমন্ত্রী। নয়াদিল্লি এখনও আলোচনার মাধ্যমে, কূটনৈতিক পথে এবং আলোচনার টেবিলে বসেই যুদ্ধের অবসানের পক্ষে। তবে গত কয়েক মাসে ভারত শুধু শান্তির আহ্বানেই থেমে থাকেনি। রাশিয়া ও ইউক্রেন, দুই দেশের সঙ্গেই আলোচনা করেছে নয়াদিল্লি।

এই আলোচনায় কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচল, শস্য আমদানি, শক্তি রফতানি এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর উপর হামলার মতো বিষয়ও উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০২২ সালেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে জানিয়েছিলেন, ‘আজকের যুগ যুদ্ধের যুগ নয়’। সাম্প্রতিক সময়েও পুতিনকে মোদীর বার্তা ছিল, ‘অনন্ত যুদ্ধ এবার যুদ্ধের অবসানের পথ ছেড়ে দিক।’

এরপরই আমেরিকার বদলে যাওয়া ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন জয়শঙ্কর। তাঁর মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হল আমেরিকার 'র‌্যাডিক্যাল রিপজিশনিং'। তাঁর ভাষায়, এটি আমেরিকার নিজের পছন্দের অবস্থান এবং এর ফলে ওয়াশিংটন 'ইচ্ছাকৃতভাবেই আরও একাকী শক্তি' হয়ে উঠছে।

জয়শঙ্করের মতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে প্রভাবিত করা দ্বিতীয় বড় বিষয় হল চিনের উত্থান। চিনের অর্থনৈতিক শক্তির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সঙ্গে চিন যুক্ত। এই অর্থনৈতিক ক্ষমতা ক্রমশ রাজনৈতিক প্রভাবেও পরিণত হচ্ছে।

তাঁর মতে, বর্তমানে আমেরিকা ও চিনের মধ্যে অত্যন্ত তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। এই প্রতিযোগিতা শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব অন্য দেশগুলির উপরও পড়ছে। বিভিন্ন দেশের হাতে থাকা অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত বা কৌশলগত সুবিধাও এই প্রতিযোগিতার মধ্যে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন জয়শঙ্কর।

তবে একই সঙ্গে তিনি বিশ্ব অর্থনীতির পারস্পরিক নির্ভরতার জটিলতার কথাও বলেন। অর্থাৎ আমেরিকা ও চিনের মধ্যে প্রতিযোগিতা যতই বাড়ুক, বিশ্বের দেশগুলি একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারছে না।

এই পরিস্থিতিতে উদীয়মান এবং মাঝারি শক্তিগুলিও নিজেদের স্বার্থ নিয়ে আরও সচেতন হচ্ছে বলে জানান জয়শঙ্কর। তাঁর মতে, এই দেশগুলি ধীরে ধীরে আত্মনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছে। ভারতের ক্ষেত্রে ‘আত্মনির্ভর’ ধারণাটি ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জয়শঙ্করের মতে, এই দেশগুলি এখন কোনও আন্তর্জাতিক আলোচনা বা দর-কষাকষির টেবিলে বসার আগে নিজেদের হাতে কী রয়েছে এবং তারা কী দিতে পারে, তা নিয়ে আরও বেশি ভাবছে। অর্থনীতি ও নিরাপত্তার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রেও তারা ঝুঁকি কমাতে চাইছে।

সব বিষয়ে একমত হওয়াই যে এখন আর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার শর্ত নয়, সেটিও স্পষ্ট করেন জয়শঙ্কর। তাঁর মতে, উদীয়মান এবং মাঝারি শক্তিগুলির মধ্যে এখন পুরোপুরি একই মত থাকা জরুরি নয়। বরং কোনও বিষয়ে যথেষ্ট মিল বা অভিন্ন স্বার্থ থাকলেই দেশগুলি একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

এর উদাহরণ দিতে গিয়ে BRICS-এর প্রসঙ্গ টানেন তিনি। তাঁর মতে, বিভিন্ন দেশ একসঙ্গে এলে তাদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর আলাদা আলাদা দেশের কণ্ঠস্বরের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে। তিনি সাফ জানান, বিশ্বের দেশগুলি এখন শুধুমাত্র বড় শক্তিগুলির নেতৃত্বের অপেক্ষায় নেই। নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন দেশ একে অপরের সঙ্গে কাজ করছে। কোথাও অভিন্ন স্বার্থ থাকলে তারা নতুন ব্যবস্থা তৈরি করছে, নির্দিষ্ট এজেন্ডা তৈরি করছে এবং সহযোগিতার নতুন অভ্যাস গড়ে তুলছে। 

Advertisement

POST A COMMENT
Advertisement